March 6, 2026, 11:09 am

ইমরান উদ্দিন আহমদ/
কুষ্টিয়ায় বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ে একটি গুজব–পরদিন সকাল থেকে নাকি পেট্রোল ও ডিজেল পাওয়া যাবে না। অজ্ঞাত উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া এই তথ্য মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার গ্রুপ এবং মুখে মুখে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে মানুষ ছুটতে শুরু করেন শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের প্রায় সব পেট্রোল পাম্পেই দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়। অনেকেই আতঙ্কে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনে রাখার চেষ্টা করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয় এবং কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও দেখা দেয়।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, রাত সড়ে ১০টার পর থেকেই কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। কোথাও কোথাও আধা কিলোমিটার পর্যন্ত লাইন পড়ে যায়। দ্রুত জ্বালানি নেওয়ার তাড়াহুড়োয় কিছু জায়গায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়।
অনেক চালক জানান, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা দেখেছেন যেখানে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে। সেই খবর শুনেই তারা রাতেই ট্যাংক ভরতে বের হন।
একজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, “ফেসবুক ও কয়েকটি মেসেঞ্জার গ্রুপে দেখলাম সকালে নাকি পেট্রোল-ডিজেল পাওয়া যাবে না। তাই রাতেই এসে ট্যাংক ফুল করে নিলাম। পরে শুনলাম বিষয়টা নাকি নিশ্চিত নয়।”
গুজবের উৎস অজানা/
স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, গুজবটির উৎস কোথায়—তা এখনো নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি মেসেঞ্জার গ্রুপ ও ফেসবুক পোস্টে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। সেই বার্তায় দাবি করা হয়, “সকাল থেকে নাকি পেট্রোল ও ডিজেল পাওয়া যাবে না” কিংবা “জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে।” বার্তাটি দ্রুত বিভিন্ন গ্রুপে ফরওয়ার্ড হতে থাকে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, অনেকেই প্রথমে বিষয়টি গুজব বলে মনে করলেও বার্তাটি বারবার বিভিন্ন পরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসতে থাকায় অনেকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালক, পরিবহন শ্রমিক ও গাড়ির মালিকদের মধ্যে খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ আবার ফোন করে পরিচিতদের কাছ থেকেও বিষয়টি জানতে চান। ফলে রাতের মধ্যেই একটি অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। একটি ছোট বার্তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় মানুষ অনেক সময় সত্যতা যাচাই না করেই তা বিশ্বাস করে বসেন। এ ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটাই ঘটেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অনেকে জানান, প্রথমে কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক জ্বালানি নিতে ফিলিং স্টেশনে গেলে অন্যরা তা দেখে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক মানুষ জ্বালানি নিতে পাম্পে ভিড় করতে থাকেন। ফলে গুজবটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে ফেলে এবং পুরো শহরে অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। একটি মেসেঞ্জার বার্তা বা ফেসবুক পোস্ট কয়েক মিনিটের মধ্যেই শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় গুজব দ্রুত জনমনে প্রভাব ফেলছে।
গুজবের সুযোগে বাড়তি বিক্রি/
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, এই পরিস্থিতিতে কিছু ফিলিং স্টেশনে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি জ্বালানি বিক্রি হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিক্রি হওয়ায় রাতেই পাম্পগুলোতে ব্যস্ততা দেখা যায়।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “সাধারণ দিনে এত বিক্রি হয় না। কিন্তু গুজব ছড়ানোর পর রাতেই শত শত মানুষ পাম্পে এসেছে। এতে পাম্প মালিকদের বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে।”
স্থানীয়দের মতে, আতঙ্কে অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনে রেখেছেন, যা রাতের বিক্রির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ বিষয় নিয়ে শহরের কুষ্টিয়া ফিলিং স্টোরের একজন পাম্প কর্মীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন ঘটনাটি তারাও কিছু জানেন না। তবে তিনি মনে করেন, মধ্যপ্যাচ্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এ ধরনের িজ্বালানী সংকটের কথা তারাও শুনে আসছিলেন।
এর সত্যতা আছে কিনা িএ বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাননি।
প্রশাসনের নজরদারির প্রশ্ন/
ঘটনার পর সচেতন নাগরিকদের মধ্যে প্রশাসনের তৎপরতা ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের মতে, রাতের দিকে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “সকাল থেকে পেট্রোল-ডিজেল পাওয়া যাবে না” এমন বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, তখনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সতর্ক বার্তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল। সময়মতো সঠিক তথ্য জানানো হলে হয়তো এত বড় বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হতো না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসায় মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে থাকে। ফলে অনেকেই বিষয়টি সত্য ধরে নিয়ে রাতেই জ্বালানি সংগ্রহে বের হয়ে পড়েন। এতে শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অস্বাভাবিক ভিড় তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা দৌড়ঝাঁপ ও ভোগান্তি বাড়ে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তারা মনে করছেন, এই ঘটনার উৎস খুঁজে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের গুজব ছড়ানোর প্রবণতা কমবে।
এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুজব ছড়ালে তা শুধু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে না, বরং বাজার ও পরিবহন ব্যবস্থাতেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত তথ্য যাচাই এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বাস্তবে কোনো সংকট নেই
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং সরকারি পর্যায়ে কোথাও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার মতো কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও নিশ্চিত করেছে যে বাজারে তেলের মজুদ ও সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি নেই।
অর্থাৎ পুরো ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ গুজবনির্ভর। যাচাই-বাছাই ছাড়াই অজ্ঞাত উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া এই খবর মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। এর ফলে অনেকেই বাস্তব পরিস্থিতি না জেনেই রাতের মধ্যেই তেল কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
ফলে শহরের বিভিন্ন পেট্রোলপাম্পে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা যায় এবং অযথা দৌড়ঝাঁপের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যদিও বাস্তবে জ্বালানি সরবরাহে কোনো সংকট ছিল না, তবুও একটি গুজব কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে—এই ঘটনাটি তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
সচেতনতার আহ্বান
এ বিষয়ে সম্মিলিত সামাজিক জোটের চেয়ারম্যান ড. আমানুর আমান বলেন, “যাচাই না করে কোনো খবর ছড়িয়ে দেওয়া এখন বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। একটি ছোট গুজব মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কের সৃষ্টি করে। কুষ্টিয়ায় জ্বালানি সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও তারই একটি উদাহরণ।”
তিনি বলেন, এ ধরনের গুজব শুধু মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে না, বরং বাজার ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা তৈরি করে এবং অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সেই পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ড. আমানুর আমান আরও বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে সেটির সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। গুজব ছড়ানো যেমন অপরাধ, তেমনি যাচাই না করে তা ছড়িয়ে দেওয়াও সামাজিকভাবে ক্ষতিকর।”
বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, গুজব প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। প্রশাসনের দ্রুত তথ্য যাচাই ও সঠিক বার্তা প্রচারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যেকোনো তথ্য শেয়ার করার আগে অন্তত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তা যাচাই করা উচিত। তবেই ভবিষ্যতে এ ধরনের গুজবনির্ভর আতঙ্ক ও অপ্রয়োজনীয় বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব হবে।