September 29, 2026, 11:38 pm

শুভব্রত আমান/
এ বছরের সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আখড়াবাড়িতে সমাপ্ত হয়েছে লালন সাঁই-এর স্মরণোৎসব। লালনের জীবদ্দশা থেকেই দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে প্রতিবছর এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে।
মুসলিম সম্প্রদায়ের রমজান মাস চলমান থাকায় এ বছর কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ-এর স্মরণোৎসব সংক্ষিপ্ত পরিসরে আয়োজন করা হয় এবং সীমিত কর্মসূচির মধ্য দিয়েই তা সমাপ্ত হয়েছে। প্রতি বছরের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের তুলনায় এবার ছিল অনেকটাই নীরব ও আনুষ্ঠানিকতা-কেন্দ্রিক পরিবেশ; সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা পরিহার করে মূলত প্রথাগত সাধুসঙ্গ ও ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ রাখা হয় আয়োজন।
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, লালনের জীবদ্দশা থেকেই দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে তাঁর অনুসারীরা আখড়াবাড়িতে সমবেত হতেন। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সেই ধারাবাহিকতা আজও বহমান। দোলপূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে বাউল, ফকির ও ভক্তরা ছেঁউড়িয়ায় মিলিত হন; চলে গান, দর্শনচর্চা ও ভাববিনিময়। তবে এ বছর রমজানের প্রেক্ষাপটে উৎসবের পরিসর সংকুচিত হওয়ায় উপস্থিতি ও আয়োজন—দু’দিক থেকেই ছিল সংযত চিত্র।
আয়োজকদের ভাষ্য, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সংস্কৃতিসেবীদের একাংশের মত, লালনের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দর্শন এমন এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা বৃহত্তর পরিসরেই উদযাপিত হওয়া প্রত্যাশিত।
সোমবার (২ মার্চ) দুপুর থেকে শুরু হয়ে মঙ্গলবার দুপুরে শেষ হয়েছে এ অনুষ্ঠান।
সাধারণত তিন দিনব্যাপী সাড়ম্বরে উদযাপিত এ উৎসবে থাকত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, বাউলগান ও গ্রামীণ মেলা। কিন্তু এবার থাকেনি না কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা মেলার আয়োজন।
সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন-এর সহযোগিতায় আলোচনা সভা ও বাউল-সাধুদের আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে সীমিত পরিসরে সম্পন্ন হয়েছে আয়োজন।
উৎসবকে ঘিরে কয়েক দিন ধরেই ছেঁউড়িয়া এলাকায় কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেলেও আগের বছরের তুলনায় উপস্থিতি কম বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিদেশ ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাউল, ফকির ও সাধুরা এলেও বড় আকারের মেলা না থাকায় সাধারণ দর্শনার্থীর সংখ্যা কম।
চুয়াডাঙ্গা থেকে আগত শান্ত ফকির বলেন, “দোলপূর্ণিমা শুভতার প্রতীক। এই দিনকে ঘিরেই সাঁইজি গুণীজন ও ভক্তদের সমাবেশ করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা গুরুপরম্পরায় এখানে আসি। এখানে এলে জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি ও মানসিক উন্নতির সুযোগ মেলে।”
আখড়াবাড়ির ভারপ্রাপ্ত খাদেম মশিউর রহমান জানান, সোমবার সন্ধ্যায় গুরুকার্য দিয়ে শুরু হবে সাধুসঙ্গ। এরপর থাকবে রাখাল সেবা, মধ্যরাতে অধিবাস, মঙ্গলবার ভোরে বাল্যসেবা এবং দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি।
তিনি বলেন, “রমজানের কারণে অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত রাখা হয়েছে। লোকসমাগমও তুলনামূলক কম।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমিত আয়োজন হলেও নিরাপত্তায় কোনো শিথিলতা ছিল না। মাজারসংলগ্ন এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন এবং মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়।
তবে সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ায় কিছু বাউল ও সংস্কৃতিসেবী আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, লালনের দর্শন সাম্য, মানবধর্ম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক—যা ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের ঊর্ধ্বে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। আবার আয়োজকদের একাংশ বলছেন, ধর্মীয় সংবেদনশীলতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এ বছর লালন স্মরণোৎসব ছিল প্রথা রক্ষা ও আনুষ্ঠানিকতা বজায় রেখে।
তবুও ভক্তদের মতে, বাহ্যিক জাঁকজমক নয়, দর্শনচর্চা ও সাধুসঙ্গই এই উৎসবের মূল আত্মা; সেটুকুই যেন অক্ষুণ্ন থাকে।