March 6, 2026, 1:36 pm

শুভব্রত আমান/
দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ঘটনা হিসেবে পরিচিত যশোর উদীচী ট্র্যাজেডির ২৭ বছর পার হলেও এখনো বিচার নিশ্চিত হয়নি। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী-এর যশোর টাউন হল মাঠের জাতীয় সম্মেলনে ভয়াবহ বোমা হামলায় ১০ জন নিহত এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।
দেশের প্রথম দিককার জঙ্গি হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এই ঘটনাটি জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তবে দীর্ঘ আইনি জটিলতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে মামলাটি এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। নিহত ও আহতদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিচারের অপেক্ষায় থাকলেও হতাশা বাড়ছে।
ভয়াবহ হামলা ও হতাহতের ঘটনা/
সূত্রমতে, ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ উদীচীর ১২তম জাতীয় সম্মেলন চলাকালে যশোর টাউন হল মাঠে শক্তিশালী দুটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে শিল্পী-কর্মীসহ ১০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রানী ঘোষ, নূর ইসলাম, ইলিয়াস মুন্সী, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম মিলন, মোহাম্মদ বুলু, রতন কুমার বিশ্বাস, শাহ আলম পিন্টু ও বাবু রামকৃষ্ণ ছিলেন।
নিহতদের মধ্যে তিনজন—শাহ আলম মিলন, রতন কুমার বিশ্বাস এবং বাবু রামকৃষ্ণ—কুষ্টিয়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার স্থবিরতা/
মামলার তদন্ত শেষে Criminal Investigation Department Bangladesh ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে। পরবর্তীতে চার্জশিটের ত্রুটির অভিযোগ ওঠে।
২০০৬ সালের ৩০ মে নিম্ন আদালত মামলার সব আসামিকে খালাস দেয়, যা সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে সরকার রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে এবং মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়।
আটক জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে উদীচী অনুষ্ঠানে বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছিলেন বলে জানা যায়। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পুনঃতদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও অগ্রগতি হয়নি।
২০১০ সালের ৮ জুন উদীচী মামলার আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া এবং কৃষ্ণা দেবনাথ-এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ শুনানি শেষে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে নোটিশ জারির নির্দেশ দেন। তবে এরপর মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে শুনানির অপেক্ষায় আটকে রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ/
সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু দাবি করেন, উদীচী মামলায় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। তিনি বলেন, তৎকালীন সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম-কে রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার ভাষ্যমতে, তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে প্রথম দিকে উপস্থিত হয়ে আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সহায়তা করেন এবং স্থানীয় মসজিদে ঘোষণা দিয়ে রক্তদানের ব্যবস্থা করেন। তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সুষ্ঠু বিচার বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও উত্তরজীবীদের আর্তনাদ/
হামলায় দুই পা হারানো আহত নাহিদ বলেন,
“আমি অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে আছি। আমরা অপরাধীদের বিচার চাই।”
এক পা হারানো আহত সুখান্ত দাস বলেন,
“বছরের পর বছর কেটে গেলেও দোষীদের শাস্তি হয়নি। সরকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।”
নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন। কুষ্টিয়ার মিলপাড়া এলাকায় নিহত রামকৃষ্ণের পরিবার, আমলাপাড়া এলাকার রতন বিশ্বাসের পরিবার এবং চৌলস বর্ডার এলাকার শাহ আলমের পরিবার একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি কর্মসূচি/
ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ
উদীচীর যশোর ও কুষ্টিয়া কার্যালয়ে আলোচনা সভা
স্মৃতিস্তম্ভে মশাল প্রজ্বালন
হামলায় নিহত তিন সাংস্কৃতিক কর্মীর স্মরণে ২০০৮ সালের ৬ মার্চ শহরের প্রধান সড়কে পৌরসভার অর্থায়নে রাম-রতন-শাহ আলম স্কয়ার স্থাপন করা হয়।