July 5, 2026, 1:41 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে। গত ১৩ মে প্রথম ইউনিটে সফলভাবে পারমাণবিক জ্বালানি সংযোজনের (ফুয়েল লোডিং) পর শুরু হয়েছে বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। তবে উৎপাদনের প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রূপপুর কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ট্যারিফ কত হবে এবং জাতীয় গ্রিড এই বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য কতটা প্রস্তুত।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, রূপপুরে উৎপাদিত বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা হবে বিপিডিবি। কিন্তু কেন্দ্রটির প্রকল্প ব্যয়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) ব্যয়সহ ট্যারিফ নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এখনো তাদের হাতে পৌঁছায়নি। বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে একাধিকবার চিঠি ও অনুস্মারক পাঠানো হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের মোট ব্যয় এবং পরিচালন ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব না পাওয়ায় বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণ কিংবা সরকারের সম্ভাব্য ভর্তুকির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, রূপপুরের বিদ্যুতের মূল্য বাল্ক ট্যারিফ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। কেন্দ্রটির দীর্ঘমেয়াদি আয়ুষ্কাল বিবেচনায় ট্যারিফ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ স্বল্প সময় ধরে ব্যয়ের হিসাব করলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাবে এবং সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপও বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, রূপপুর কেন্দ্রের ট্যারিফ নির্ধারণের জন্য এখনো কমিশনের কাছে কোনো প্রস্তাব জমা পড়েনি। তিনি বলেন, এটি যেহেতু ব্যয়ভিত্তিক প্রকল্প, তাই প্রচলিত জনশুনানি ছাড়াও ট্যারিফ নির্ধারণের সুযোগ থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ট্যারিফ নয়, বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নিয়েও এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, রূপপুর প্রকল্পের ট্যারিফ নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। তার মতে, অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করা কঠিন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হবে, সেটিও এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ শুধু উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে সঞ্চালন ব্যয়, স্পিনিং রিজার্ভ, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ব্যয়সহ নানা বিষয় যুক্ত থাকে। তাই জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে ট্যারিফ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম রূপপুর প্রকল্পের ফরেনসিক, কারিগরি ও জ্বালানি নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ এবং ব্যয়ের বিশদ বিবরণ প্রকাশ না করে ট্যারিফ নির্ধারণ করা হলে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
শুধু ট্যারিফ নয়, জাতীয় গ্রিড রূপপুরের বিদ্যুৎ নিরাপদভাবে গ্রহণ করতে পারবে কি না, সেটিও এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, বর্তমান সঞ্চালনব্যবস্থা পারমাণবিক বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারিত মানের নিচে নেমে গেলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং বড় ধরনের গ্রিড বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ খান অবশ্য জানিয়েছেন, রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রান্সমিশন লাইন প্রস্তুত রয়েছে এবং জাতীয় গ্রিড বিদ্যুৎ গ্রহণে সক্ষম। তবে তিনি স্বীকার করেন, বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ একই গ্রিডে পরিচালনার কারণে ফ্রিকোয়েন্সির ভারসাম্য বজায় রাখা একটি বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। এজন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণকারী সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে ট্যারিফ নির্ধারণ, প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়, পরিচালনা ব্যয়, গ্রিডের সক্ষমতা এবং জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাসহ সব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন শুরুর পাশাপাশি এসব বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া না হলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও কারিগরি—উভয় ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।