October 3, 2026, 4:05 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশের কৃষি আজ শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জের মুখে নয়, বরং মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষারও সম্মুখীন। দেশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে মাটির জৈব পদার্থের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা, পানি ধারণক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত ‘ইয়ারবুক অব এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০২৫’-এ দেশের মৃত্তিকার একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেশের ভূমিকে ২০টি প্রধান ভৌগোলিক একক এবং ৩০টি কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলে ভাগ করে মাটির গঠন, অম্লতার মাত্রা, জৈব পদার্থের পরিমাণ, ভূমির ধরন এবং স্বাভাবিক উর্বরতার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব তথ্য কৃষি পরিকল্পনা, ফসল নির্বাচন, সারের সুষম ব্যবহার এবং অঞ্চলভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ এখনো নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লেভেল বরেন্দ্র ট্র্যাক্ট, হাই বরেন্দ্র ট্র্যাক্ট, উত্তর-পূর্ব বরেন্দ্র ট্র্যাক্ট, মধুপুর ট্র্যাক্ট, উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা, পুরোনো হিমালয় পাদদেশ সমভূমি, সক্রিয় তিস্তা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল, তিস্তা মিয়ান্ডার বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল এবং সক্রিয় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল। এসব এলাকার অনেক ক্ষেত্রেই মাটির স্বাভাবিক উর্বরতাও নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যম পর্যায়ে অবস্থান করছে।
বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে পানি ধারণক্ষমতা কম, জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে এবং উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা সীমিত। একইভাবে মধুপুর ট্র্যাক্টের মাটি তুলনামূলকভাবে অম্লীয় এবং জৈব পদার্থে দরিদ্র। উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকাগুলোর মাটিতেও একই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা কৃষি উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তবে দেশের সব অঞ্চলের চিত্র এক নয়। লোয়ার আত্রাই বেসিন, গঙ্গা জোয়ার-ভাটা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল, গোপালগঞ্জ-খুলনা বিল এবং সিলেট অববাহিকায় জৈব পদার্থের পরিমাণ মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এসব অঞ্চলের অনেক স্থানে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতাও তুলনামূলকভাবে ভালো, যা কৃষি উৎপাদনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির জৈব পদার্থ কেবল উদ্ভিদের পুষ্টির উৎস নয়; এটি মাটির গঠন উন্নত করে, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করে, পুষ্টি উপাদান ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং অণুজীবের কার্যক্রম সক্রিয় রাখে। জৈব পদার্থ কমে গেলে মাটির উৎপাদনশীলতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায় এবং রাসায়নিক সারের কার্যকারিতাও সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা বলছেন, একই জমিতে বছরের পর বছর নিবিড় চাষাবাদ, জৈব সার ও কম্পোস্টের সীমিত ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাঠ থেকে সরিয়ে ফেলা এবং সুষম মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার অভাব জৈব পদার্থ হ্রাসের প্রধান কারণ। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার, সবুজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং সংরক্ষণমূলক কৃষি ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)ও টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে এ ধরনের ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব বিবেচনায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং এ খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৮ লাখ ৭০ হাজার। ফলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা কেবল কৃষি উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের আয়, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অঞ্চলভিত্তিক মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা, সুষম সার প্রয়োগ, জৈব সার ও কম্পোস্টের ব্যবহার বৃদ্ধি, ফসলের অবশিষ্টাংশ পুনরায় মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মাটির জৈব পদার্থের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। টেকসই কৃষির ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষাকে এখন উন্নয়ন নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।