August 8, 2026, 9:44 am


তাকিয়া আফরোজ সাদিয়া/
এক সময় নারীর স্বপ্ন সীমাবদ্ধ ছিল সংসারের চার দেয়ালে। পরিবারের দায়িত্ব পালনই যেন ছিল তাঁদের জীবনের প্রধান পরিচয়। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির প্রসার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অদম্য প্রত্যয়কে পুঁজি করে কুষ্টিয়ার অনেক নারী আজ গড়ে তুলছেন নিজস্ব উদ্যোগ, লিখছেন সাফল্যের নতুন গল্প। যাঁদের কথা এখানে বলা হচ্ছে, তাঁরা মূলত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—অর্থাৎ সীমিত পুঁজি, স্বল্প পরিসরের উৎপাদন এবং নিজস্ব শ্রম ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা ছোট আকারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু হলেও তাঁদের অনেকের উদ্যোগ ধীরে ধীরে লাভজনক ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
কেউ ঘরে তৈরি শুকনো খাবার, দই, মশলা ও আচার নিয়ে কাজ করছেন, আবার কেউ তৈরি করছেন হ্যান্ডমেড পোশাক, কুশিকাটার সামগ্রীসহ নান্দনিক হস্তশিল্প। নিজেদের মেধা, সৃজনশীলতা ও নিরলস পরিশ্রমকে মূলধন করে তাঁরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন না, অন্য নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছেন। ফলে তাঁদের এই উদ্যোগ কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করার এক অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।
কুষ্টিয়ার নারী উদ্যোক্তা কোহিনুর খাতুনের গল্প এমনই এক সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প। ‘কুহি’ নামে নিজের অনলাইন উদ্যোগ শুরু করেছিলেন ছোট্ট একটি স্বপ্ন নিয়ে—মানুষের দোরগোড়ায় নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও ভেজালমুক্ত ঘরে তৈরি শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া। তবে শুরুটা ছিল বেশ কঠিন। পণ্যের মান ধরে রাখা, ক্রেতার আস্থা অর্জন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের পরিচিতি তৈরি—প্রতিটি ধাপেই তাঁকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
কোহিনুর বলেন, “শুরুর দিকে অনেকেই ঘরে তৈরি খাবারের ওপর আস্থা রাখতেন না। কিন্তু আমি কখনো মানের সঙ্গে আপস করিনি। ধীরে ধীরে ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি। পরিবারের সহযোগিতাই আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহস জুগিয়েছে।”
আরেক সফল নারী উদ্যোক্তা লাইলাতুল ফেরদৌস তৃষ্ণা। করোনা মহামারির সময় ঘরে বসেই ‘স্বরলিপি ড্রিমস’ নামে হ্যান্ডমেড কুশিকাটার পণ্যের যাত্রা শুরু করেন তিনি। প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজের তৈরি পোশাক ও কুশিকাটার পণ্য বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে তাঁর পণ্যের গুণগত মান ও নান্দনিক নকশা ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করে। বাড়তে থাকে অর্ডারের সংখ্যাও।
তৃষ্ণা জানান, ২০২১ সালে মাত্র চার মাসেই তিনি প্রায় ৫০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন। বর্তমানে তাঁর তৈরি পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি ইংল্যান্ড, ইতালি এবং আরও কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
তিনি বলেন, “ভালো মানের পণ্য আর ক্রেতাদের বিশ্বাসই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। দেশের বাইরেও নিয়মিত অর্ডার পাওয়া একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমার জন্য বড় প্রাপ্তি।”
তবে সাফল্যের এই পথ মোটেও মসৃণ নয়। নারী উদ্যোক্তারা জানান, ব্যবসার শুরুতে মূলধনের সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার সেবার সীমাবদ্ধতা এবং অনলাইন প্রতারণার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গিও নারীদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে। বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, পর্যাপ্ত বাজারসুবিধার অভাব এবং নিয়মিত প্রদর্শনী বা বিক্রয়মেলার সীমিত সুযোগও তাঁদের ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এরপরও মানসম্মত পণ্য, গ্রাহকের আস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে তাঁরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে চলেছেন।
কুষ্টিয়ার নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত ও সক্ষম করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কুনাও (KUNAO)। বর্তমানে সংগঠনটির সদস্যসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এই প্ল্যাটফর্ম নারী উদ্যোক্তাদের একত্রিত করে তাঁদের পরিচিতি বৃদ্ধি, নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং বাজারসংশ্লিষ্ট নানা কার্যক্রমেও সহায়তা দিচ্ছে।
নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়।
বিসিক কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক সোহেল রানা বলেন, “বর্তমানে কুষ্টিয়ায় নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে শুকনো খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, মশলা এবং হ্যান্ডমেড পণ্যের ব্যবসা দ্রুত প্রসার লাভ করছে। মানসম্মত উৎপাদন ও অনলাইনভিত্তিক বিপণনের কারণে এসব পণ্যের চাহিদা জেলার সীমানা ছাড়িয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে বিদেশেও পণ্য রপ্তানি করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে বিসিক নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, হিসাবরক্ষণ, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং ব্যবসা ব্যবস্থাপনার ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ, ঋণ আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় পরামর্শও প্রদান করা হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং, ই-কমার্সভিত্তিক বিপণন এবং দেশ-বিদেশে নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা গেলে কুষ্টিয়ায় নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে শুধু নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নই নয়, স্থানীয় শিল্প, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
স্বপ্ন, সাহস, অধ্যবসায় আর সৃজনশীলতার অনন্য সমন্বয়ে কুষ্টিয়ার নারী উদ্যোক্তারা আজ নতুন এক সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁদের এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে—সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও সামান্য সহযোগিতা পেলে একজন নারী শুধু নিজের ভাগ্যই বদলান না; বদলে দিতে পারেন একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি অঞ্চলের অর্থনীতির গতিপথও।