November 8, 2026, 3:12 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
গ্রাম আছে, গ্রাম পুলিশও আছে; এবার গ্রামে পুলিশিং প্রতিষ্ঠিত হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস/ ইতিহাসের বাঁকবদল ও রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের উত্থান শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও আদর্শে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ চলছে: উপাচার্য প্রাথমিক শিক্ষায় ৪১ হাজার কোটি টাকা: বরাদ্দের অঙ্ক নয়, শিক্ষার মানই হোক সাফল্যের মাপকাঠি ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে: প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ার চার প্রতিবেশীর চেয়ে বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি দ্বিতীয় পদ্মা সেতু: বৈরী স্রোত পেরিয়ে তৈরি করবে আরেক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ এলপিজির দাম সমন্বয় হোক, কিন্তু মানুষের জীবনকে অসমন্বিত রেখে নয় ২৮ বছরের ছাত্ররাজনীতি, ছেলের এইচএসসি পাসের পোস্ট ঘিরে আলোচনা; বিলুপ্ত চুয়াডাঙ্গা ছাত্রদলের কমিটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার পাঁচ সপ্তাহের ক্ষণগণনা শুরু

গ্রাম আছে, গ্রাম পুলিশও আছে; এবার গ্রামে পুলিশিং প্রতিষ্ঠিত হোক

ড. আমানুর আমান

বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা নতুন আশার আলো, কিন্তু গ্রামীণ নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন মর্যাদা, দক্ষতা ও কার্যকর ক্ষমতায়ন

বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে একটি পরিচিত বাস্তবতা আছে। গ্রাম আছে, গ্রাম পুলিশও আছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পুলিশিং নেই। রাতের অন্ধকারে কোনো বাড়িতে চুরি হলে, জমি নিয়ে বিরোধ বাধলে, অপরিচিত মানুষের আনাগোনা দেখা গেলে কিংবা কোনো অপরাধের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে গ্রামের যে মানুষটির সবার আগে বিষয়টি জানার কথা, তিনি হচ্ছেন গ্রাম পুলিশ। অথচ সেই মানুষটির নিজের জীবনেই নিরাপত্তা, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও পেশাগত মর্যাদার অভাব দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোকে আমরা প্রয়োজনের সময় স্মরণ করি, কিন্তু তাদের প্রয়োজনের সময় রাষ্ট্র কতটা পাশে দাঁড়ায়, সেই প্রশ্নটি খুব কমই আলোচিত হয়।

৭ নভেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশ সেই পুরোনো প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, অবসরকালীন আনুতোষিক, যাতায়াত ভাতা, মোবাইল ভাতা, নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ এবং মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এসেছে। প্রায় ৪১ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে এই আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতির বিষয়টিও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের আলোচনায় এসেছে। তবে সমাবেশের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বাইরে গিয়ে ঘোষণাগুলোর বাস্তব তাৎপর্য এবং ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন নিয়ে ভাবতে হবে।

প্রথমেই দেখা যাক কী ঘোষণা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাধারণ গ্রাম পুলিশের মাসিক বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রাম পুলিশ প্রধানের বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা করা হয়েছে। অবসরকালীন আনুতোষিক সাধারণ সদস্যদের জন্য ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং প্রধানদের জন্য ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। থানায় যাতায়াত ভাতা সাধারণ সদস্যদের ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং প্রধানদের ৬০০ টাকা করা হয়েছে। প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাসিক ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতার ঘোষণাও এসেছে। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে নতুন করে দুজন নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ, নারী সদস্যদের ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি, বাইসাইকেল সরবরাহের সময়সীমা কমানো এবং প্রতিটি ইউনিয়নের একটি দীর্ঘ সড়ক গ্রাম পুলিশের নামে নামকরণের উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের গাছ বিক্রির অর্থ সংশ্লিষ্ট গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বণ্টনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই ঘোষণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার গ্রাম পুলিশকে কেবল একটি ঐতিহ্যগত গ্রামীণ সহায়ক বাহিনী হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতুল বেতন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের মধ্যে কাজ করা মানুষের জন্য তিন হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে বর্তমান বাজারদর, খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় বিবেচনা করলে এই বেতনকে পর্যাপ্ত বলা যাবে না। উৎসাহ সৃষ্টির জন্য এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ; কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার জন্য আরও বড় আর্থিক সংস্কার প্রয়োজন।

গ্রাম পুলিশের উন্নয়নের ইতিহাসও একেবারে শূন্য থেকে শুরু হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৯৭৬ সালে গ্রাম পুলিশকে জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পরিপত্র জারির তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৯৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে গ্রাম পুলিশের জন্য ঈদ বোনাস চালুর কথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। ২০০৮ সালে গ্রাম পুলিশকে চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর সমস্কেল দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০১১ সালে জাতীয় বেতন স্কেলের আলোকে তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতা নির্ধারণের বিধান আসে। ২০১৫ সালে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চাকরির শর্তাবলি নিয়ে পৃথক বিধিমালা প্রণীত হয়। ২০১৫ সালে বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালে অবসরকালীন অনুদান এবং ২০১৮ সালে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের কথাও বিভিন্ন সংবাদ ও সরকারি নথিতে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ গ্রাম পুলিশের উন্নয়ন কোনো একটি সরকারের একক অবদান নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আবার অনেক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নও অসম্পূর্ণ থেকেছে। ২০১৮ সালের বেতন বৃদ্ধির পরও ২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রাম পুলিশের জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘ ৪৮ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য, চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আদালতেও আলোচনা হয়েছে। ফলে ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে, ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধারাবাহিক বাস্তবায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: গ্রাম পুলিশ আসলে কী করবে? স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৪৮ ধারায় গ্রাম পুলিশ বাহিনী গঠন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের বিধিমালায়ও তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ও দায়িত্বের ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু আইনি কাঠামো থাকলেই কার্যকর পুলিশিং প্রতিষ্ঠিত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ।

একজন গ্রাম পুলিশ তার এলাকার মানুষকে চেনেন। কোন বাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে, কোথায় দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে, কোন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে, কোথায় বাল্যবিবাহের প্রস্তুতি চলছে, কোন পরিবারটি সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে—এসব তথ্য তাঁর জানা সম্ভব। স্থানীয়ভাবে অপরাধ প্রতিরোধে এই জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু তথ্য জানা আর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য আছে। গ্রাম পুলিশকে যদি কেবল থানায় খবর পৌঁছে দেওয়া কিংবা সরকারি নির্দেশ পালন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তাঁর সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার হবে না।

গ্রাম পুলিশ উঠে দাঁড়ালে সমাজের লাভ কোথায়? প্রথমত, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিকারের পরিবর্তে অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধের সুযোগ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষের নিরাপত্তায় স্থানীয় পর্যায়ে একটি পরিচিত সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তৃতীয়ত, মাদক, বাল্যবিবাহ, মানবপাচার, চুরি, জুয়া ও সামাজিক বিরোধের মতো সমস্যার প্রাথমিক তথ্য দ্রুত প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। চতুর্থত, দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা কিংবা জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে গ্রাম পুলিশ মানুষের কাছে দ্রুত বার্তা পৌঁছে দিতে পারবেন। পঞ্চমত, সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মধ্যে আস্থার একটি সেতু তৈরি হবে।

তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে একটি সতর্কতাও জরুরি। গ্রাম পুলিশকে যেন স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির হাতিয়ারে পরিণত করা না হয়। তাঁর দায়িত্ব হবে নিরপেক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করা। কাউকে গ্রেপ্তার, শাস্তি দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগতভাবে বিচার করার ক্ষমতা তাঁর হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। আইনসম্মত দায়িত্ব ও মানবিক আচরণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।”

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার গ্রাম পুলিশকে কেবল একটি ঐতিহ্যগত গ্রামীণ সহায়ক বাহিনী হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপ্রতুল বেতন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের মধ্যে কাজ করা মানুষের জন্য তিন হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে বর্তমান বাজারদর, খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় বিবেচনা করলে এই বেতনকে পর্যাপ্ত বলা যাবে না। উৎসাহ সৃষ্টির জন্য এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ; কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার জন্য আরও বড় আর্থিক সংস্কার প্রয়োজন।

গ্রাম পুলিশের উন্নয়নের ইতিহাসও একেবারে শূন্য থেকে শুরু হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৯৭৬ সালে গ্রাম পুলিশকে জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পরিপত্র জারির তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৯৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে গ্রাম পুলিশের জন্য ঈদ বোনাস চালুর কথা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। ২০০৮ সালে গ্রাম পুলিশকে চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর সমস্কেল দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ২০১১ সালে জাতীয় বেতন স্কেলের আলোকে তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বেতন-ভাতা নির্ধারণের বিধান আসে। ২০১৫ সালে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চাকরির শর্তাবলি নিয়ে পৃথক বিধিমালা প্রণীত হয়। একই বছর বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালে অবসরকালীন অনুদান এবং ২০১৮ সালে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের কথাও বিভিন্ন সংবাদ ও সরকারি নথিতে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ গ্রাম পুলিশের উন্নয়ন কোনো একটি সরকারের একক অবদান নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আবার অনেক সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নও অসম্পূর্ণ থেকেছে। ২০১৮ সালের বেতন বৃদ্ধির পরও ২০২৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রাম পুলিশের জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘ ৪৮ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য, চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আদালতেও আলোচনা হয়েছে। ফলে ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে, ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধারাবাহিক বাস্তবায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: গ্রাম পুলিশ আসলে কী করবে? স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৪৮ ধারায় গ্রাম পুলিশ বাহিনী গঠন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের বিধিমালায়ও তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ও দায়িত্বের ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু আইনি কাঠামো থাকলেই কার্যকর পুলিশিং প্রতিষ্ঠিত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ।

একজন গ্রাম পুলিশ তার এলাকার মানুষকে চেনেন। কোন বাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে, কোথায় দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে, কোন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে, কোথায় বাল্যবিবাহের প্রস্তুতি চলছে, কোন পরিবারটি সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছে—এসব তথ্য তাঁর জানা সম্ভব। স্থানীয়ভাবে অপরাধ প্রতিরোধে এই জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু তথ্য জানা আর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য আছে। গ্রাম পুলিশকে যদি কেবল থানায় খবর পৌঁছে দেওয়া কিংবা সরকারি নির্দেশ পালন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তাঁর সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার হবে না।

গ্রাম পুলিশ উঠে দাঁড়ালে সমাজের লাভ কোথায়? প্রথমত, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিকারের পরিবর্তে অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধের সুযোগ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষের নিরাপত্তায় স্থানীয় পর্যায়ে একটি পরিচিত সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তৃতীয়ত, মাদক, বাল্যবিবাহ, মানবপাচার, চুরি, জুয়া ও সামাজিক বিরোধের মতো সমস্যার প্রাথমিক তথ্য দ্রুত প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। চতুর্থত, দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা কিংবা জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে গ্রাম পুলিশ মানুষের কাছে দ্রুত বার্তা পৌঁছে দিতে পারবেন। পঞ্চমত, সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মধ্যে আস্থার একটি সেতু তৈরি হবে।

তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে একটি সতর্কতাও জরুরি। গ্রাম পুলিশকে যেন স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির হাতিয়ারে পরিণত করা না হয়। তাঁর দায়িত্ব হবে নিরপেক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করা। কাউকে গ্রেপ্তার, শাস্তি দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগতভাবে বিচার করার ক্ষমতা তাঁর হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। আইনসম্মত দায়িত্ব ও মানবিক আচরণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

এখন প্রয়োজন কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। প্রথমত, প্রতিটি গ্রাম পুলিশের জন্য নিয়মিত মৌলিক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। অপরাধের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার এবং তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ইউনিয়নে গ্রাম পুলিশ, ইউনিয়ন পরিষদ, বিট পুলিশিং কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় সভা হওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রত্যেক সদস্যের পরিচয়পত্র, ইউনিফর্ম, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও যোগাযোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ১৫০ টাকার মোবাইল ভাতা দিলেই হবে না; দায়িত্ব পালনের উপযোগী যোগাযোগব্যবস্থাও প্রয়োজন।

চতুর্থত, তাদের চাকরির স্থায়িত্ব, অবসরকালীন নিরাপত্তা, চিকিৎসা সহায়তা এবং পরিবারের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। জাতীয়করণ কিংবা বিকল্প কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রশ্নে সরকারকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পঞ্চমত, নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগের ঘোষণাটি বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীরা স্থানীয় নিরাপত্তা, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, নারী ও শিশুর অভিযোগ গ্রহণ এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে নিয়োগের পাশাপাশি তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও যথাযথ মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের ঘোষিত ‘গ্রাম পুলিশ সড়ক’ এবং সামাজিক বনায়নের উদ্যোগটিও ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু এর বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। গাছের মালিকানা, পরিচর্যা, বিক্রির নিয়ম এবং অর্থ বণ্টনের হিসাব প্রকাশ্য হতে হবে। অন্যথায় একটি ভালো উদ্যোগও ভবিষ্যতে স্থানীয় বিরোধের কারণ হতে পারে। একইভাবে সাইকেল সরবরাহের সময়সীমা কমানোর পাশাপাশি সাইকেল রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সবশেষে বলতে চাই, গ্রাম পুলিশকে শক্তিশালী করা মানে শুধু কয়েক হাজার মানুষের বেতন বাড়ানো নয়; এটি দেশের তৃণমূল নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। দেশের প্রতিটি গ্রাম নিরাপদ হলে ইউনিয়ন নিরাপদ হবে, ইউনিয়ন নিরাপদ হলে উপজেলা নিরাপদ হবে। আর এই নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে উঠবে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ থেকে।

৭ নভেম্বরের ঘোষণা গ্রাম পুলিশের জীবনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবতায় রূপ নেয়। সরকার যদি ঘোষণাগুলো যথাসময়ে কার্যকর করে, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং গ্রাম পুলিশকে স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকর অংশে পরিণত করতে পারে, তাহলে এটি হবে গ্রামীণ সমাজের জন্য একটি বড় অর্জন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তা কেবল থানার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। নিরাপত্তার শুরু মানুষের বাড়ির উঠানে, গ্রামের পথে, হাটে-বাজারে এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্কের ভেতর থেকে। সেই জায়গাগুলোতে গ্রাম পুলিশই হতে পারেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের প্রতিনিধি।

তাই আজ সময় এসেছে শুধু গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়ানোর আনন্দে থেমে না থেকে তাঁদের যথার্থ মর্যাদা ও কার্যকর দায়িত্ব প্রতিষ্ঠার। কারণ, গ্রাম পুলিশ যদি সত্যিকার অর্থে উঠে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে শুধু একটি বাহিনী নয়, উঠে দাঁড়াবে গ্রামীণ সমাজের নিরাপত্তা, আস্থা ও সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকামক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net