October 3, 2026, 4:46 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়ামের নতুন চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। রাশিয়া থেকে আকাশপথে ঢাকায় আনার পর সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তায় সড়কপথে পরিবহন করা জ্বালানিবাহী গাড়িবহরটি শনিবার (৩ অক্টোবর) বেলা ১২টা ২০ মিনিটের দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে।
এর আগে শুক্রবার রাত ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে তেজস্ক্রিয় পারমাণবিক জ্বালানিবাহী বিশেষ কার্গো বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। শনিবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে জ্বালানিবাহী গাড়িবহর। বঙ্গবন্ধু সেতু অতিক্রম করে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার দাশুড়িয়া হয়ে বহরটি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়।
প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জ্বালানির চালানটি গ্রহণ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কাজাখস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে নির্ধারিত বিরতি দিয়ে আকাশপথে চালানটি বাংলাদেশে আনা হয়। প্রথমে বৃহস্পতিবার চালানটি পৌঁছানোর কথা থাকলেও পরে সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার গভীর রাতে বিমানটি ঢাকায় অবতরণ করে।
জ্বালানি পরিবহনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যানজট এড়াতে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গাড়িবহরটি চলাচলের সময় সংশ্লিষ্ট সড়কে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) প্রণব কুমার জানান, ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি নির্বিঘ্নে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছাতে জেলা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। কোনো ধরনের বিঘ্ন এড়াতে বেলা পৌনে ১২টা থেকে সোয়া ১২টা পর্যন্ত পাবনা-নাটোর-কুষ্টিয়া মহাসড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। বহরটি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশের পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৯ কার্গো ফ্লাইটে জ্বালানি
বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মোট নয়টি কার্গো ফ্লাইটে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটের জন্য ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আনা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাতটি কার্গো দ্বিতীয় ইউনিটের মূল জ্বালানি সরবরাহের জন্য এবং দুটি কার্গো প্রথম ইউনিটের পরবর্তী রিফুয়েলিংয়ের কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুসারে ডিসেম্বরের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে রূপপুর
২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে কমিশনিংয়ের বিভিন্ন কারিগরি কার্যক্রম ও পরীক্ষার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়েছে।
বিশেষ করে প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি)–সংক্রান্ত কারিগরি জটিলতা কমিশনিং কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছিল। সম্প্রতি ১৬ মেগাপ্যাসকেল উচ্চচাপে সংশ্লিষ্ট সেফটি ভালভের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে এনপিসিবিএল কর্তৃপক্ষ। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের আগে আরও কয়েকটি বাধ্যতামূলক ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানির ধারাবাহিক সরবরাহ এবং কারিগরি পরীক্ষার অগ্রগতি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কমিশনিং কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে জ্বালানি পৌঁছানো বা নির্দিষ্ট কোনো যন্ত্রের পরীক্ষা সফল হওয়া মানেই বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়ে যাওয়া নয়; এর আগে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই, কমিশনিংয়ের ধাপ এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন সম্পন্ন করতে হবে।
দেশের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প
বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক কম-কার্বন বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে প্রকল্পটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। পরবর্তী সংশোধিত প্রাক্কলনে ব্যয় বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
নতুন জ্বালানি চালান পৌঁছানো এবং সেফটি ভালভের পরীক্ষা সফল হওয়ার খবর প্রকল্পটির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তবে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় নির্ভর করবে অবশিষ্ট কমিশনিং পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার ওপর।