February 19, 2026, 1:37 pm

ড. আমানুর আমান/, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সময়ের নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্ত থাকে—যেগুলো কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং মানসিকতা, শাসনদর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সূচনা করে। সাম্প্রতিক সময়ে তেমন এক অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন তারেক রহমান—বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া–এর জ্যেষ্ঠ সন্তান, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসন শেষে এক নতুন প্রত্যয়ের ভাষা নিয়ে জাতির সামনে ফিরে এসেছেন।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর উচ্চারিত সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যময় ঘোষণা—“আই হ্যাভ আ প্ল্যান”—শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; বরং তা ছিল এক পুনর্গঠিত রাষ্ট্রদর্শনের ইঙ্গিত। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাচনী সমাবেশে তিনি যে পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কার। জনগণের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন ঘটে নির্বাচনের ফলাফলে—যেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি এককভাবে সরকার গঠনের দায়িত্ব পান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনীতির প্রচলিত রীতিনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাহ্যিক জৌলুস থেকে নিজেকে দূরে রেখে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, গাড়িবহর সীমিতকরণ, অপ্রয়োজনীয় প্রোটোকল কমানো কিংবা মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে স্থানান্তরের মতো পদক্ষেপগুলো শুধু প্রশাসনিক সরলীকরণ নয়—এগুলো ক্ষমতার নৈতিক সংযমের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। নাগরিক ভোগান্তি কমানো এবং রাষ্ট্রকে মানুষের নিকটবর্তী করে তোলার এই প্রচেষ্টা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ধরনের নীরব পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত অবস্থানেও তিনি তুলনামূলক সংযত কিন্তু দৃঢ় ভাষা ব্যবহার করেছেন। অন্যায়, নির্যাতন ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা যেমন আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় বহন করে।
প্রশাসনের প্রতি তাঁর আহ্বান—দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ করার—রাষ্ট্রযন্ত্রকে পেশাদার ও নিরপেক্ষ করার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ বাস্তবমুখী শাসনচিন্তার দিকেই ইঙ্গিত করে।
রাজনৈতিক সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও তাঁর আচরণ লক্ষণীয়। বিভিন্ন মতাদর্শের জাতীয় নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং নিজে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে সংলাপে বসা—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সংলাপের সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করার এক প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতির ভেতরেও পারস্পরিক সম্মান ও সমন্বয়ের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাসনোত্তর অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর নেওয়া উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ধারা সৃষ্টির সম্ভাবনা জাগিয়েছে। যদি এই নৈতিক সংযম, প্রশাসনিক সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা ধারাবাহিকতা পায়, তবে তা শুধু একটি সরকারের সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও পরিণত ও মানবিক করে তুলতে পারে।
অতএব, বর্তমান সময়কে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বলা যথেষ্ট নয়; বরং এটি হতে পারে রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্লিখনের এক সূচনা। সেই পুনর্লিখনের কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান—যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এখন প্রত্যাশা, সংশয় ও সম্ভাবনার এক জটিল কিন্তু আশাব্যঞ্জক সমীকরণ রচনা করছে বাংলাদেশ-এর ভবিষ্যৎ ইতিহাসে।