March 17, 2026, 12:08 pm

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান এবং আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান।
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন
আজ ১৭ মার্চ—বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য দিন। এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯২০ সালের এই দিনে তিনি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন শেখ লুৎফর রহমান এবং মা সায়েরা খাতুন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। পরিবারের সবার আদরের ‘খোকা’ নামেই তিনি ছোটবেলায় পরিচিত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে বাঙালির আবেগ অন্যরকম। কারণ তিনি শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা এনে দেননি, তিনি বাঙালি জাতিকে দিয়েছেন স্বাধীন পরিচয়, মর্যাদা ও আত্মমর্যাদার নতুন ঠিকানা। তাঁর নেতৃত্বে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম বিশ্বব্যাপী নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।
ভারত বিভাজনের পর ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উপমহাদেশীয় রাজনীতির ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুই প্রথম সাহসী প্রতিবাদ উচ্চারণ করেছিলেন। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের বিপরীতে যে বিভাজন রাজনীতি সমাজকে মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, বঙ্গবন্ধু সেই রাজনীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি বুঝতে পারে—স্বাধীন পরিচয় ছাড়া তাদের মুক্তি নেই।
এই উপলব্ধির চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ—যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শৈশব থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানসিকতা এবং গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাঁকে রাজনীতির পথে নিয়ে আসে। গ্রামের স্কুল থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু। ১৯২৭ সালে গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। পরে ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যয়ন করেন। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। অসুস্থ শরীর নিয়েও ১৯৪১ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন।
ম্যাট্রিক পাসের পর কিশোর মুজিব কলকাতায় যান এবং ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরে যায়। পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতো প্রখ্যাত নেতাদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে শেখ মুজিব ঢাকায় চলে আসেন। নতুন রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে ১৯৪৮ সালে তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৯ সালে নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের পথ আরও সুদৃঢ় হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি জাতি তাঁর ছয় দফা কর্মসূচির পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। পরে ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান এবং আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হান্নান।
শুরু হয় মুাক্তর লড়াই। বাঙালি জাতি প্রায় নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জন করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহু কবি-সাহিত্যিক তাঁদের লেখায় গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ব্যক্ত করেছেন। কিংবদন্তি কবি ও প্রাবন্ধিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের অমর পঙ্ক্তি যেন তাঁর প্রতি জাতির অমলিন শ্রদ্ধার প্রতীক—
“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান,
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”
দুঃখজনকভাবে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের এই মহান স্থপতি সপরিবারে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—একজন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা গেলেও তাঁর আদর্শ, তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্বাধীনতার চেতনাকে কখনো মুছে ফেলা যায় না।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।