March 17, 2026, 3:59 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
ভর্তি পরীক্ষা ফিরছে/ অভিভাবকদের অতি উৎসাহ, শিক্ষকদের কোচিং নির্ভরতা—শিশুশিক্ষা আবারও বাণিজ্যের দোরগোড়ায়? ১৫ মাসে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে: ইউনুস সরকার অনুপ্রবেশ ঠেকাতেও ব্যর্থ, প্রত্যাবাসনেও আজ স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন এনসিপি নেতারা গণভোট নিয়ে ‘অর্ধেক বুঝেছেন’: আইনমন্ত্রী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, আয় দ্বিগুণের লক্ষ্য: জানালেন প্রধানমন্ত্রী অস্কার ২০২৬: সেরা ছবি ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’, বিজয়ীদের তালিকা অস্থিরতা প্রশমনের প্রত্যাশা/কুষ্টিয়ার নতুন জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান পুরোনো সিলেবাসে বৃত্তি পরীক্ষা/দ্বৈত পড়ার চাপে পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ রায়/সর্বশেষঅবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নারী ক্রিকেটারদের জন্য নতুন টুর্নামেন্ট ‘বিসিবি উইমেন্স কাপ’

ভর্তি পরীক্ষা ফিরছে/ অভিভাবকদের অতি উৎসাহ, শিক্ষকদের কোচিং নির্ভরতা—শিশুশিক্ষা আবারও বাণিজ্যের দোরগোড়ায়?

ড. আমানুর আমান, লেখক, গবেষক, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস/
বাংলাদেশের শিক্ষায় বিশেস করে শিশুশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি অদ্ভুত প্রতিযোগিতা বহুদিন ধরেই চোখে পড়ে—এ প্রতিযোগিতাটি হলো কে আগে সন্তানকে ‘নামিদামি’ স্কুলে ঢোকাতে পারে তার জন্য। আর সেই প্রতিযোগিতার বড় জ্বালানি হয়ে উঠেছে অভিভাবকদের অতি উৎসাহ এবং কিছু শিক্ষকের কোচিং নির্ভর মানসিকতা। কারন এখানে শিশুর মেধা বিকাশের চেয়ে একটি তথাকথিত ভাল স্কুল ফ্যক্টর হয়ে দেখা দিয়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আবার ফিরছে স্কুলের ভর্তি পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আবারও কোচিং-বাণিজ্যের পুরোনো দরজা খুলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০১৯ সালে লটারি পদ্ধতি চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘নামিদামি’ স্কুলগুলোতে ভর্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিশাল বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভাঙা। কারণ তখন এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, যেখানে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করাতে অভিভাবকদের লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হতো। কোথাও কোথাও ডোনেশন, সুপারিশ কিংবা গোপন লেনদেন ছাড়া ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
লটারি চালুর পর সেই প্রবণতায় কিছুটা হলেও লাগাম টানা সম্ভব হয়েছিল। ভর্তি কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন কমে যায়, শিক্ষকরাও প্রকাশ্যে কোচিং ব্যবসায় নামতে সংকোচ বোধ করেন, আর সবচেয়ে বড় কথা—অভিভাবকদের অর্থের অযথা অপচয় অনেকটা কমে।
কিন্তু এখন আবার ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত যেন পুরোনো সেই দরজাটিই খুলে দিচ্ছে।
অভিভাবকদের অতি উৎসাহ: সমস্যার বড় শিকড়/
আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত মানসিকতা বহুদিন ধরে গেঁথে আছে—সন্তানকে যেকোনো মূল্যে একটি ‘নামি’ স্কুলে ভর্তি করাতেই হবে। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, তার আনন্দময় শৈশব কিংবা মানসিক চাপ—এসব বিষয় তখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। যেন একটি স্কুলের নামই নির্ধারণ করে দেবে সন্তানের ভবিষ্যৎ। ফলে দেখা যায়, মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশুকেও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে কোচিং সেন্টারের দরজায় হাজির করা হচ্ছে। কোথাও ভর্তি কোচিং, কোথাও ব্যক্তিগত শিক্ষক, আবার কোথাও মডেল টেস্টের নামে ছোট্ট শিশুটিকে প্রতিযোগিতার এক নিষ্ঠুর দৌড়ে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যে বয়সে শিশুর মাঠে দৌড়ানোর কথা, গল্প শোনার কথা, কৌতূহল নিয়ে পৃথিবীকে চিনে নেওয়ার কথা—সেই বয়সেই তাকে বসতে হচ্ছে পরীক্ষার টেবিলে।
বাস্তবতা হলো, এই কোচিং-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি কিন্তু কোচিং সেন্টার নয়—বরং অতি উৎসাহী অভিভাবকেরাই। তাদের অস্থিরতা, সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার প্রতিযোগিতা এবং ‘নামি’ স্কুলের মোহই কোচিং বাজারকে ক্রমশ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলেছে। অভিভাবকদের এই অন্ধ প্রতিযোগিতা না থাকলে এত বড় কোচিং সাম্রাজ্য কখনোই গড়ে উঠত না।
শিক্ষকদের কোচিং নির্ভরতা/
অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনের ভেতরেও এই বাস্তবতাকে সুযোগ হিসেবে দেখার প্রবণতা কম নয়। অনেক শিক্ষক আছেন, যারা নিয়মিত পাঠদানের দায়িত্ব শেষ করেই কোচিং সেন্টার কিংবা ব্যক্তিগত টিউশনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের নতুন পথ খুঁজে নেন। ফলে ভর্তি পরীক্ষা যত বাড়ে, কোচিং বাজারও তত দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে—এটাই দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।
একসময় রাজধানীর অলিগলি, দেয়াল কিংবা বিদ্যুতের খুঁটিতে চোখ পড়লেই দেখা যেত বিশাল ব্যানার—কোন শিক্ষক কোথায় ভর্তি কোচিং করাবেন, কোন স্যার ‘গ্যারান্টি’ দিয়ে ভিকারুননিসা বা আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি করাবেন। শিক্ষার চেয়ে তখন যেন বেশি প্রচার পেত ‘ভর্তি প্রস্তুতি’ নামের এক অঘোষিত ব্যবসা।
লটারি পদ্ধতি চালুর পর সেই দৃশ্য অনেকটাই মিলিয়ে গিয়েছিল। ভর্তি কোচিংয়ের ব্যানার কমেছে, অন্তত প্রকাশ্যে সেই প্রতিযোগিতার তীব্রতাও কিছুটা থেমেছিল। কিন্তু এখন আবার ভর্তি পরীক্ষা ফিরে এলে সেই পুরোনো দৃশ্য নতুন করে মাথাচাড়া দেবে—এমন আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। কারণ বাস্তবতা হলো, পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কোচিং বাণিজ্যও প্রায় অবধারিতভাবে ফিরে আসে।
শিক্ষা না প্রতিযোগিতা?
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে—প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য একটি শিশুকে কি সত্যিই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে? যে বয়সে একটি শিশুর শেখার প্রক্রিয়া হওয়া উচিত আনন্দময় ও স্বতঃস্ফূর্ত, সেই বয়সেই কি তাকে প্রতিযোগিতার কঠোর কাঠামোর মধ্যে ঠেলে দেওয়া যুক্তিযুক্ত?
শিক্ষাবিদদের মতে, এই বয়সে কোনো শিশুর প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা বা সম্ভাবনা নির্ভুলভাবে পরিমাপ করার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নেই। বরং খুব অল্প বয়সে পরীক্ষাভিত্তিক প্রতিযোগিতার চাপ শিশুর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, শেখার আনন্দকে নষ্ট করে দিতে পারে এবং শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তাকে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপে ফেলে দিতে পারে। তবু বাস্তবতা হলো, সমাজে ‘নামিদামি’ স্কুলে ভর্তির যে এক ধরনের সামাজিক মর্যাদা তৈরি হয়েছে, তা অনেক অভিভাবককে এই প্রতিযোগিতার বাইরে থাকার সুযোগই দেয় না। ফলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের প্রশ্নটি পেছনে পড়ে যায়, সামনে চলে আসে একটি আসনের জন্য অদৃশ্য কিন্তু নির্মম দৌড়।
মূল সমস্যা অন্য জায়গায়/
আসলে ভর্তি পরীক্ষা হোক বা লটারি—কোনোটিই সমস্যার প্রকৃত সমাধান নয়। সমস্যার মূল শিকড় লুকিয়ে আছে শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে থাকা মানের বৈষম্যে। যতদিন দেশের সব স্কুলে সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা না যাবে, ততদিন এই প্রতিযোগিতা, উদ্বেগ এবং বাণিজ্যিক প্রবণতা ঘুরে-ফিরে একই জায়গায় ফিরে আসবে।
যদি দেশের প্রতিটি স্কুলেই মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা যেত, তাহলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সামনে এত দীর্ঘ ভর্তি লাইন তৈরি হতো না। তখন অভিভাবকদেরও সন্তানের জন্য একটি স্কুলের দরজায় মরিয়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বপ্নের স্কুল’ হিসেবে দেখা হয়, আর অধিকাংশ স্কুলকে ধরা হয় কেবল ‘বিকল্প’ হিসেবে। এই অসম বাস্তবতাই অভিভাবকদের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয় এবং সেই সুযোগে কোচিং-বাণিজ্য ও ভর্তিবাণিজ্য নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অন্য কথায়, শিক্ষার মানের এই বৈষম্যই পুরো সমস্যার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে আছে।
শেষ কথা/
ভর্তি পরীক্ষা ফিরছে—এটি নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া অনেক গভীর ও বহুমাত্রিক। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক প্রবণতা এবং সামাজিক মর্যাদার লড়াই বহুদিন ধরে জমে আছে, ভর্তি পরীক্ষা ফিরে এলে সেটিই আবার নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। যদি অভিভাবকদের অতি উৎসাহী মনোভাব, শিক্ষকদের কোচিং নির্ভরতা এবং কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না যায়, তাহলে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সঙ্গে সঙ্গেই পুরোনো সেই চক্র আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে—কোচিং সেন্টারের দৌড়ঝাঁপ, ভর্তিকে ঘিরে অঘোষিত অর্থ লেনদেন এবং শিশুদের ওপর অকাল প্রতিযোগিতার চাপ।
তখন আবারও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়াবে—
আমরা কি সত্যিই শিশুদের শিক্ষিত করতে চাই, নাকি খুব অল্প বয়স থেকেই তাদের একটি নির্মম প্রতিযোগিতার বাজারে ঠেলে দিচ্ছি?

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net