April 19, 2026, 11:53 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘদিন তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। নতুন নির্ধারিত এ মূল্য ১৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ায় রোববার সকাল থেকেই দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে নতুন দামে তেল বিক্রি শুরু হবে। এই মূল্য বৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানির দামের ধারাবাহিক অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার চাপ এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে সরকার অবশেষে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দাবি করা হয়েছে। এই বৃদ্ধির ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের দামে এর প্রতিফলন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গত দেড় বছরের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হলো। আগে জেট ফুয়েল ছাড়া অন্যান্য জ্বালানির দাম স্থির রাখা হলেও, শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামলাতে সরকারকে সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে হয়েছে।
সর্বশেষ সমন্বয়ে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিন বেড়েছে ১১২ থেকে ১৩০ টাকায়। অকটেন এখন ১৪০ টাকা, যা আগে ছিল ১২০ টাকা। আর পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকায়। অর্থাৎ এক লাফে প্রতিটি জ্বালানিতেই ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হবে ভোক্তাদের।
তবে এই বৃদ্ধি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে জমে ওঠা চাপের বহিঃপ্রকাশ। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত প্রায় দেড় বছরে জ্বালানি তেলের দাম ধাপে ধাপে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালের শেষভাগে যেখানে ডিজেলের দাম ছিল ৮০ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে, তা এখন ১১৫ টাকায় পৌঁছেছে। কেরোসিনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র—প্রায় ৮৫-৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা। অকটেন ও পেট্রোলও প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন সরাসরি অনুভব করতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। কারণ জ্বালানি তেল শুধু একটি পণ্য নয়, বরং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চালিকাশক্তি। এর দাম বাড়লে তার ঢেউ একে একে ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।
সবার আগে এর প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। ডিজেলনির্ভর বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের খরচ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। শহরের কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ যাত্রী—সবার দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে কৃষিখাতেও এর প্রভাব গভীর। সেচযন্ত্র চালাতে ডিজেল লাগে, ফসল মাঠ থেকে বাজারে আনতেও লাগে জ্বালানি। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষক শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের মধ্যেই যোগ করতে বাধ্য হন। এর ফল গিয়ে পড়ে ভোক্তার পাতে—সবজির দাম, চাল-ডাল, এমনকি মাছ-মাংসের বাজারও ধীরে ধীরে চড়তে শুরু করে।
এখানেই শেষ নয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে, বিশেষ করে ডিজেল বা তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে, আর সেই চাপ সামাল দিতে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য প্রতিটি বাড়তি টাকা ব্যয়ের হিসাব বদলে দেয়। বাজারের খরচ বাড়ে, সঞ্চয় কমে, আর জীবনযাত্রার মান ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে।
সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ঘন ঘন মূল্য সমন্বয়ের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁক না বাড়ালে এই চাপ ভবিষ্যতে আরও প্রকট হতে পারে।
দেড় বছরের ধারাবাহিক এই মূল্যবৃদ্ধি এখন আর কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতায় প্রতিটি লিটার জ্বালানি এখন শুধু একটি পণ্য নয়—এটি হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের নতুন মানদণ্ড।
পাম্প মালিকদের অভিনন্দন/
্এদিকে, দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি। সংগঠনটির সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে এক বার্তায় এ প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করায় সরকার প্রশংসার দাবিদার। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মজুত প্রবণতা কমবে এবং বিক্রয় ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা আসবে।