May 31, 2026, 2:25 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১০ জনকে আটক হয়েছে। রোববার (৩১ মে) ভোরে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে বিজিবির হাতে আটক ১০ জনের মধ্যে ছিলেন ৩ জন নারী, ২ জন পুরুষ এবং ৫ জন শিশু। বিজিবি জানিয়েছে, তারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করছিলেন।
ঘটনাটি নিছক একটি ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ বা সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি একটি বৃহত্তর মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার শিকার হচ্ছে নারী, শিশু এবং দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠী। আইন অনুযায়ী এটি অবশ্যই একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে প্রশ্ন হলো—কেন বারবার নারী ও শিশুদের নিয়ে পরিবারগুলো সীমান্তে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় নামছে?
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে চিহ্নিত করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক দরিদ্র মুসলিম ও প্রান্তিক মানুষকে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। এর ফলে বহু পরিবার আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ সীমান্তমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে ধরা পড়া প্রতিটি মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দেখার আগে তাদের সামাজিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা পরিচয়সংকটের মতো নানা কারণে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে।
দর্শনায় আটক হওয়া ১০ জনের ঘটনাও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার বাইরে নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে পাঁচ শিশুর উপস্থিতি ইঙ্গিত করে যে এটি কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের অভিযান নয়; বরং একটি পরিবার বা কয়েকটি পরিবারের অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার গল্পও এর পেছনে থাকতে পারে।
অবশ্য সীমান্ত সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের দায়িত্ব বিজিবির। অবৈধ পারাপার রোধে তাদের নিয়মিত টহল ও অভিযানও চলমান রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, নাগরিকত্ব, যাত্রার কারণ এবং সম্ভাব্য মানবিক ঝুঁকির বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
সীমান্তে নারী-শিশুসহ ১০ জন আটকের খবর তাই কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সংবাদ নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত রাজনীতি, নাগরিকত্বের বিতর্ক, পরিচয়ের সংকট এবং প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তাহীনতার একটি প্রতিচ্ছবিও বটে। যতদিন এসব মূল কারণের সমাধান না হবে, ততদিন সীমান্তে এমন মানবিক নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।