April 28, 2026, 9:46 pm

ড.আমানুর আমানের কলাম
সম্পাদক প্রকাশক মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস/
সোজা কোথায় এখন শুধু অপেক্ষার পালা, কবে থেকে বিদ্যুৎ যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে। সম্ভাবনার সকল আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সম্ভাবনার সকল দুয়ার খুলে গেছে। বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এ সম্ভাবনা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করছে। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা, আমদানিনির্ভরতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ—সব মিলিয়ে একটি টেকসই সমাধানের প্রয়োজন অনেকদিন ধরেই অনুভূত হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু একটি প্রকল্প নয়; এটি দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের এক সাহসী উদ্যোগ।
রূপপুরের বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন। বিশ্বের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর কাতারে যুক্ত হওয়া শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং এটি কৌশলগত সক্ষমতারও প্রতীক। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই কেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জন্য এর তাৎপর্য আরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি এবং উৎপাদন ব্যয়ের উচ্চতা একটি বড় সমস্যা ছিল। রূপপুর চালু হলে এই অঞ্চল সরাসরি জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পাবে, ফলে শিল্পায়ন, কৃষি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে। এতে আঞ্চলিক বৈষম্য কমার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল।
তবে সম্ভাবনার উজ্জ্বল দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও অনিবার্যভাবে সামনে আসে। পারমাণবিক শক্তি যেমন বিপুল ক্ষমতার উৎস, তেমনি এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ—যেখানে সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তাই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করা—এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাস্তবতা হলো, শুধু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হয় সেখান থেকেই। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে প্রয়োজন নির্ভুল পরিচালনা, কঠোর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান হালনাগাদ রাখা এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমন্বয় করাও অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, এই সম্ভাবনাময় প্রকল্পই ভবিষ্যতে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রকল্পের ব্যয় বিশাল, এবং এর একটি বড় অংশ বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। যদিও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও ঋণ পরিশোধ, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার বিষয়গুলোকে কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি স্বাধীনতা।
বর্তমানে বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে ভারত থেকে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে থাকে। এই নির্ভরতা একদিকে স্বল্পমেয়াদে ঘাটতি পূরণে সহায়ক হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা তৈরি করে—কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাজারমূল্য কিংবা নীতিগত পরিবর্তনের ওপর এর সরবরাহ অনেকাংশে নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, ফলে আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে আসবে এবং জ্বালানি খাতে একটি স্থিতিশীলতা তৈরি হবে।
তবে শুধুমাত্র একটি বা দুটি বৃহৎ প্রকল্পের ওপর নির্ভর করে পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি নীতি, যেখানে পারমাণবিক শক্তির পাশাপাশি সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন করা হবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়া এখন সময়ের দাবি। তাই রূপপুর নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি হলেও, টেকসই ও পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ অপরিহার্য।
সবশেষে বলা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য এক দ্বিমুখী বাস্তবতা—একদিকে সম্ভাবনার দীপশিখা, অন্যদিকে দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জের ভার। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এই প্রকল্প দেশের উন্নয়নের গতিপথ বদলে দিতে পারে। অন্যথায়, এটি একটি ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আজকের বাস্তবতায় রূপপুর আমাদের জন্য কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং নীতিগত পরিপক্বতার এক প্রতীক। এটি আমাদের দেখার একটি আয়না—আমরা কতটা দূরদর্শী পরিকল্পনা করতে পারি, কতটা দক্ষতার সঙ্গে জটিল প্রযুক্তি পরিচালনা করতে পারি এবং সবচেয়ে বড় কথা, কতটা দায়িত্বশীলভাবে একটি সংবেদনশীল খাতকে এগিয়ে নিতে পারি।
এই প্রকল্পের সফলতা বা ব্যর্থতা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সিদ্ধান্ত, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার একটি মানদণ্ড হয়ে থাকবে। তাই রূপপুর আসলে এক বহুমাত্রিক পরীক্ষাক্ষেত্র—যেখানে আমাদের সক্ষমতা যেমন যাচাই হবে, তেমনি আমাদের দায়িত্ববোধ ও দূরদর্শিতার প্রকৃত মূল্যায়নও ঘটবে।