April 30, 2026, 4:15 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
রাজবাড়ীর কালুখালী পেঁয়াজ বাজারে বহুদিন ধরে চলে আসা একটি পুরোনো কিন্তু বিতর্কিত প্রথার বিরুদ্ধে এবার সরাসরি মাঠে নেমেছে প্রশাসন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ধলতা’ বা ‘শুকনা’ নামে অতিরিক্ত পণ্য আদায়ের অভিযোগে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে উপজেলা প্রশাসন। বুধবার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে বাজারের আড়তদার, পাইকার ও ব্যবসায়ীদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়—কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ওজন নেওয়া যাবে না।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপ শুধু একটি বাজার তদারকি অভিযান নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে কৃষকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের অলিখিত শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থান বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসন বলছে াভিযান অব্যাহত থাকবে।
জানা গেছে, গ্রামীণ কৃষিপণ্যের বাজারে ‘ধলতা’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। এর অর্থ হলো—নির্ধারিত ওজনের বাইরে অতিরিক্ত পণ্য দিতে বাধ্য করা। সাধারণত ৪০ কেজির এক মণ পেঁয়াজ বিক্রির ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছ থেকে ৪২, ৪৪, এমনকি ৪৫-৪৬ কেজি পর্যন্ত নেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা একে কখনও “শুকনা”, কখনও “ঝরতি”, আবার কখনও “বাজারের নিয়ম” বলে চালিয়ে দেন।
বাস্তবে এটি কৃষকের জন্য সরাসরি আর্থিক ক্ষতির কারণ। একজন কৃষক যদি প্রতি মণে ৪-৫ কেজি অতিরিক্ত দিতে বাধ্য হন, তবে শত শত মণ পণ্য বিক্রির সময় তার ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় বিপুল অঙ্কে। অথচ এই ক্ষতির কোনো হিসাব বাজার ব্যবস্থায় দৃশ্যমান হয় না।
কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, বাজারে প্রভাবশালী আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা এই অন্যায্য নিয়ম মেনে নিতে বাধ্য হন। কেউ প্রতিবাদ করলে তার পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া, কম দাম প্রস্তাব করা বা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কালুখালী পেঁয়াজ বাজারে পরিচালিত অভিযানে ইউএনও ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, “ধলতা” নামে অতিরিক্ত পণ্য নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। বাজারে উপস্থিত কৃষকদেরও সচেতন করা হয়, যাতে তারা অতিরিক্ত ওজন না দেন এবং নিজেদের ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকেন।
অভিযান চলাকালে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জারি করা সরকারি নির্দেশনাও ব্যবসায়ীদের সামনে তুলে ধরা হয়। ওই নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কৃষিপণ্য কেনাবেচার সময় অতিরিক্ত পণ্য আদায় করা ‘ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮’-এর পরিপন্থী এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, কৃষকের আর্থিক ক্ষতি রোধ এবং বাজারে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
কৃষকের নীরব ক্ষোভ/
বাংলাদেশের কৃষক উৎপাদনের সময় যেমন প্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করেন, তেমনি বাজারজাতকরণের সময়ও নানা অনিয়মের শিকার হন। বীজ, সার, সেচ ও শ্রমের বাড়তি খরচ বহন করার পর যখন কৃষক বাজারে আসেন, তখন ন্যায্যমূল্য তো দূরের কথা—ওজনের ক্ষেত্রেও তাকে প্রতারিত হতে হয়।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেরার গোপারপুর গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন জানান, “মণ হিসেবে পেঁয়াজ বিক্রি করি, কিন্তু দিতে হয় আরও কয়েক কেজি বেশি। না দিলে আড়তদার মাল নেয় না।” কেউ কেউ জানান, এ প্রথা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে নতুন কৃষকেরাও বাধ্য হয়ে তা মেনে নেন।
মাহবুবুল আরফিন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষকের মতে, কৃষকের এই অতিরিক্ত ক্ষতি শেষ পর্যন্ত কৃষিকে অলাভজনক করে তোলে। এতে উৎপাদক নিরুৎসাহিত হন এবং কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
প্রশাসনের অভিযানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তবে তারা মনে করছেন, একদিনের অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বাজারে স্বচ্ছ ওজন ব্যবস্থা, ডিজিটাল পরিমাপ যন্ত্র, নিয়মিত মনিটরিং এবং কৃষকদের সংগঠিত অংশগ্রহণ ছাড়া এই প্রথা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।
কালুখালীর অভিযানের পর অনেক কৃষকই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, প্রশাসন যদি নিয়মিতভাবে বাজার তদারকি করে, তাহলে অন্তত প্রকাশ্যে অতিরিক্ত ওজন আদায়ের প্রবণতা কমবে।