June 13, 2026, 4:14 pm

ড. আমানুর আমানের কলাম
বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে এক অস্বস্তিকর সত্যের সামনে—মূল্যস্ফীতি এখন আর কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় চাপ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যখন মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, নাকি রাজনৈতিক ও নীতিগত আশাবাদের একটি ঘোষণামাত্র?
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি ঘুরপাক খাচ্ছে প্রায় ৯ শতাংশের আশেপাশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে অন্তত দেড় থেকে দুই শতাংশ পয়েন্ট কমানো দরকার, যা এক বছরের মধ্যে অর্জন করা সহজ কাজ নয়—বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ একই সঙ্গে সক্রিয়।
সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্যটি ব্যাখ্যা করা যায় একটি নীতিগত বার্তা হিসেবে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান, মুদ্রানীতির শৃঙ্খলা এবং বাজার ব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতির কাঠামো এই লক্ষ্যকে কতটা সহায়তা করতে পারবে, সেটাই মূল প্রশ্ন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির প্রধান চালক এখন শুধু চাহিদা নয়, বরং সরবরাহ ও ব্যয়ের চাপ। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে, যা ধাপে ধাপে ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, এবং বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। এই বাস্তবতায় শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই দ্রুত ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
গবেষণা সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণও একই ইঙ্গিত দেয়। সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ৭.৫ শতাংশে নামানো লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু সুদের হার বা মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; বরং খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় কমানো জরুরি। বিশেষ করে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, চাঁদাবাজি এবং বাজার মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো না গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
ব্যবসায়ী মহলও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক। তাদের মতে, উৎপাদন খরচ ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে শিল্প খাত নতুন করে সংকটে পড়তে পারে। এই অবস্থায় বাজারে পণ্যের দাম কমার বদলে উল্টো বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। ফলে সরকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করতে হলে বাস্তবায়নযোগ্য নীতি ও কঠোর তদারকি একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আশাবাদী যুক্তি রয়েছে। তারা বলছে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার মনিটরিং জোরদার এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—এই পদক্ষেপগুলোর ফল সাধারণত স্বল্প সময়ে দৃশ্যমান হয় না। অর্থনীতিতে এ ধরনের সংস্কারের প্রভাব সময়সাপেক্ষ।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার ব্যবস্থায় অস্বচ্ছতা, অবৈধ খরচ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে নীতিগত লক্ষ্য যতই উচ্চাভিলাষী হোক, বাস্তব ফল পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
তবে একেবারে অগ্রহণযোগ্যও বলা যায় না এই লক্ষ্যকে। যদি সরকার সমন্বিতভাবে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি একসঙ্গে কার্যকর করতে পারে, তাহলে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা সম্ভব। ইতিহাস বলছে, বহু দেশই কঠোর নীতি ও সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে—কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি তাই একেবারে সাদা-কালো নয়। ৭.৫ শতাংশে মূল্যস্ফীতি নামানো একদিকে যেমন নীতিগতভাবে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য, অন্যদিকে বর্তমান কাঠামোগত বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ বাজার অস্থিরতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে কাজ করলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অবশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়—এই লক্ষ্য কি অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, নাকি নীতিনির্ধারকদের একটি আশাবাদী প্রতিশ্রুতি? উত্তর নির্ভর করবে আগামী এক বছরের নীতি বাস্তবায়নের গতিশীলতা, বাজার ব্যবস্থার শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার ওপর।
+++++
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস