June 9, 2026, 10:38 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভার ঝাউতলা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা আবারও আলোচনায় এনেছে গ্রামীণ অর্থনীতি, এনজিও ঋণব্যবস্থা এবং প্রবাসনির্ভর জীবনের ঝুঁকিকে। সোমবার সকালে নিজ ঘর থেকে জুলিয়া খাতুন (২৭) নামের এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি একটি চিরকুট রেখে গেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত দুঃখ ও ক্ষমা চাওয়ার কথাই প্রধান ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুলিয়ার স্বামী শাহেদ ইসলাম জাহিদ প্রায় ছয় মাস আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কাতারে পাড়ি জমান। পরিবারের আশা ছিল, বিদেশে গিয়ে তিনি ভালো আয় করবেন এবং দ্রুত ঋণ পরিশোধ সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। বিদেশে গিয়ে তিনি প্রত্যাশিত কাজ না পাওয়ায় নিয়মিত আয় করতে ব্যর্থ হন। ফলে দেশে থাকা পরিবার সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে থাকে।
ধীরে ধীরে এনজিও ও ব্যাংকের কিস্তির চাপ বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্যরা কেউ কেউ আংশিকভাবে কিস্তি পরিশোধ করলেও তা যথেষ্ট ছিল না। দুই মাসের কিস্তি বকেয়া পড়ে যায় বলে জানা যায়। এর মধ্যে একটি এনজিওর মাত্র দুই হাজার টাকার কিস্তি পরিশোধের দিনেই ঘটে যায় এই ট্র্যাজেডি।
পরিবার ও প্রতিবেশীদের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলিয়া দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন। স্বামীর বিদেশে অনিশ্চিত আয়, ঋণের বোঝা এবং কিস্তির চাপ—সব মিলিয়ে তিনি এক ধরনের নিঃসঙ্গ ও অসহায় অবস্থার মধ্যে ছিলেন। যদিও পরিবারের দাবি, তাদের মধ্যে কোনো পারিবারিক কলহ ছিল না, তবে অর্থনৈতিক চাপই মূল সংকট হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া চিরকুটে জুলিয়া লিখেছেন, তিনি কারো প্রতি কোনো অভিযোগ রাখতে চান না এবং সবাই যেন তাকে ক্ষমা করে দেন। তার কথায় পারিবারিক ভালোবাসা ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে তিনি তার ছোট মেয়েকে দেখাশোনার অনুরোধ করেন।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—দায় কার? সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা কঠিন হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একাধিক কাঠামোগত সমস্যার ফল। একদিকে রয়েছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার কঠোর কিস্তি চাপ, অন্যদিকে রয়েছে প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তা। বিদেশে কাজ না পেলে পরিবারের ওপর ঋণের বোঝা পড়ে যায়, যা অনেক সময় সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য বিমোচনের পরিবর্তে “দেনার চক্র” তৈরি করে, যেখানে আয় না বাড়লেও নিয়মিত কিস্তির চাপ অপরিবর্তিত থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক লজ্জা ও মানসিক চাপ, যা অনেক সময় চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে এটি অর্থনৈতিক সংকটজনিত আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি আরও গভীর সামাজিক বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে—যেখানে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ঋণ এবং অনিশ্চয়তা মিলিয়ে এক ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়।
এই ঘটনা তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, প্রবাসনির্ভর জীবন ও ঋণ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি নীরব প্রতিচ্ছবি।