July 26, 2026, 4:07 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
ইউনুসের ৭ হাজার নতুন মাল্টিমিলিয়নেয়ার হিসাব, নৈতিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতার সমাজতত্ত্ব স্থানীয় সরকার নির্বাচন/গণতন্ত্রের নতুন পরীক্ষা চলমান প্রকল্পের কাজ সরকারি বিধি অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে হবে: ইবি উপাচার্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ/ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে স্পিকার দুই দিনে কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে ১৩ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ বিএসএফ ৮০৩ শিশু মৃত্যূ: সংখ্যার নৈতিক অভিঘাত /মৃত্যুর হিসাব আছে, দায়ের হিসাব কোথায়? ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ: ২২টি ডাস্টবিন স্থাপন এক মুক্তিযোদ্ধার রাজনৈতিক বৈপরীত্য/গাজী নজরুলের উত্থান, বিতর্ক ও শেষ পরিণতি ভালো ফলন, সন্তোষজনক দামে চাঙা পশ্চিমাঞ্চলের পাটের বাজার কুষ্টিয়ায় মাদ্রাসায় ঘুমিয়ে থাকা শিশুকে বলাৎকার/ হুজুর বলল ‘মনে করো তুমি স্বপ্ন দেখতেছ’

ইউনুসের ৭ হাজার নতুন মাল্টিমিলিয়নেয়ার হিসাব, নৈতিক রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতার সমাজতত্ত্ব

ড. আমানুর আমান

বিপ্লব, গণ-অভ্যুত্থান কিংবা শাসন পরিবর্তন—ইতিহাসে এগুলোর প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে মানুষের একটি চিরন্তন প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে। সেই প্রত্যাশা হলো, অন্যায়ের অবসান হবে, দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা হবে এবং রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়, জবাবদিহি ও সুশাসন। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস বারবার একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছে—ক্ষমতা কি সত্যিই চরিত্র বদলায়, নাকি শুধু ক্ষমতাভোগীর পরিচয় বদলায়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়ে দেশে ব্যক্তি শ্রেণির কোটি টাকার বেশি ব্যাংক হিসাব বেড়েছে সাত হাজারেরও বেশি—প্রায় ২১ শতাংশ। একই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ঐতিহাসিক পতন, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির বাস্তবতা ছিল দেশের অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই নতুন সম্পদের উৎস কোথায়?

এখানেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসিক তত্ত্বগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

ইতালীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভিলফ্রেডো প্যারেটো তাঁর Elite Circulation Theory-তে বলেছিলেন, বিপ্লবের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—এটি খুব কম ক্ষেত্রেই এলিট শ্রেণিকে বিলুপ্ত করে; বরং পুরোনো এলিটকে সরিয়ে নতুন এলিটকে ক্ষমতায় বসায়। জনগণ মনে করে রাষ্ট্র বদলেছে, কিন্তু বাস্তবে বদলায় ক্ষমতার সুবিধাভোগীদের মুখ। রাষ্ট্রযন্ত্র, সম্পদ বণ্টনের কাঠামো এবং প্রভাবের রাজনীতি একই থাকে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতা কি সেই তত্ত্বকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে?

শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল—দলীয়করণ, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি, রাষ্ট্রের ওপর গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সম্পদ সঞ্চয়। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নৈতিক ভিত্তিই ছিল এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনরোষ। মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এবার রাষ্ট্রে ব্যক্তির নয়, প্রতিষ্ঠানের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গায়েতানো মস্কা আরও একধাপ এগিয়ে বলেছিলেন, প্রতিটি সমাজেই একটি সংগঠিত সংখ্যালঘু শেষ পর্যন্ত অসংগঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠকে শাসন করে। ক্ষমতার প্রশ্নে আদর্শের চেয়ে সংগঠনই বেশি কার্যকর। তাই প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে কি পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে একটি নতুন সংগঠিত সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে উঠেছে?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু প্রশ্নটি তোলাই গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।

কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের কর্মকর্তারা এবং বিশ্লেষকরাও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর চাঁদাবাজি, প্রভাব-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের নতুন কেন্দ্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি এই আশঙ্কা সত্য হয়, তবে সেটি কেবল একটি সরকারের ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্র সংস্কারের নৈতিক প্রকল্পের ব্যর্থতা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট মাইকেলস তাঁর বিখ্যাত Iron Law of Oligarchy-তে দেখিয়েছিলেন, যে কোনো আন্দোলন, যতই গণতন্ত্রের কথা বলুক না কেন, ক্ষমতায় গেলে ধীরে ধীরে নিজস্ব অলিগার্কি বা ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি করে। আন্দোলনের নেতা প্রশাসনের নেতা হন, প্রশাসনের নেতা হয়ে ওঠেন ক্ষমতার অভিভাবক, আর ক্ষমতার চারপাশে জন্ম নেয় নতুন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী।

বাংলাদেশ কি সেই অনিবার্য রাজনৈতিক নিয়তির দিকেই এগিয়েছে?

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল তাঁর moral capital—নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা। তিনি নিজেকে এমন এক বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন, সুশাসনের পক্ষে এবং দলীয় আধিপত্যের ঊর্ধ্বে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস একটি কঠিন সত্য শেখায়—নৈতিক নেতৃত্ব প্রশাসনিক সক্ষমতার বিকল্প নয়।

ম্যাক্স ওয়েবার বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র টিকে থাকে ব্যক্তির সততার ওপর নয়, বরং দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং নিয়মভিত্তিক আমলাতন্ত্রের ওপর। যদি সেই প্রশাসনকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সৎ উদ্দেশ্যও পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনা এখানেই। তারা কি প্রশাসনকে নতুন রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছিল? তারা কি রাষ্ট্রযন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ করতে পেরেছিল? নাকি পুরোনো প্রভাবের জায়গায় নতুন প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

এ প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর আজও মেলেনি।

অর্থনীতিবিদ অ্যান ক্রুগার যে Rent-Seeking Theory দিয়েছেন, সেখানে বলা হয়েছে—অনেক সময় মানুষ উৎপাদন, উদ্ভাবন বা বিনিয়োগের মাধ্যমে নয়; রাজনৈতিক প্রভাব, লাইসেন্স, দখল, চাঁদাবাজি বা প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহার করেই সম্পদ অর্জন করে। অর্থাৎ সম্পদ সৃষ্টি নয়, ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানই হয়ে ওঠে সম্পদ অর্জনের প্রধান উপায়।

যদি ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অল্প সময়ে একটি নতুন ধনী শ্রেণি গড়ে ওঠে, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তাদের সম্পদের উৎস স্বচ্ছভাবে যাচাই করা। কারণ এতে নির্দোষ ব্যক্তিরাও সুরক্ষা পান, আবার অপরাধীরাও আইনের বাইরে থাকতে পারেন না।

ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস রবিনসন তাঁদের Why Nations Fail গ্রন্থে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র তখনই সফল হয় যখন প্রতিষ্ঠানগুলো inclusive হয়—অর্থাৎ সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করে। আর রাষ্ট্র ব্যর্থ হয় যখন প্রতিষ্ঠানগুলো extractive হয়ে যায়—অর্থাৎ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা একটি গোষ্ঠী রাষ্ট্রের সম্পদ ও সুযোগ নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে।

বাংলাদেশের জন্য আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই—আমরা কি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ছি, নাকি কেবল সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পরিচয় বদলাচ্ছি?

অবশ্য ন্যায়বিচারের স্বার্থে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি। কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়ে যাওয়া মানেই দুর্নীতি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। দুর্বল ব্যাংক থেকে শক্তিশালী ব্যাংকে আমানত স্থানান্তর, এফডিআর পুনর্বিন্যাস কিংবা হিসাব বিভাজনের মতো বৈধ কারণও থাকতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তিকে বা কোনো সরকারকে কেবল একটি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে অপরাধী বলা দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ নয়।

কিন্তু একইভাবে এটিও সত্য যে, একটি সরকার যখন নৈতিকতার ভাষায় ক্ষমতায় আসে, তখন তার জবাবদিহির মানও সাধারণ সরকারের চেয়ে অনেক বেশি হয়। কারণ সে নিজেই সেই মানদণ্ড নির্ধারণ করে।

Principal–Agent Theory আমাদের শেখায়, জনগণ হলো principal, সরকার হলো agent। জনগণ সরকারকে ক্ষমতা দেয় এই বিশ্বাসে যে সরকার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে। কিন্তু যখন সেই প্রতিনিধি নিজস্ব স্বার্থ, গোষ্ঠীগত স্বার্থ বা নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের স্বার্থ রক্ষা করতে শুরু করে, তখন তাকে বলা হয় agency failure—অর্থাৎ প্রতিনিধিত্বের ব্যর্থতা।

জুলাই আন্দোলনের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। যদি সেই আন্দোলনের পরও নতুন সুবিধাভোগী শ্রেণি জন্ম নিয়ে থাকে, তবে সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; সেটি একটি নৈতিক ব্যর্থতাও।

এই কারণেই বর্তমান সরকারের উচিত বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না বানিয়ে একটি স্বাধীন, তথ্যভিত্তিক ও পেশাদার তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বয়ে কোটি টাকার নতুন হিসাবগুলোর উৎস বিশ্লেষণ করা উচিত। কারা এই নতুন মাল্টিমিলিয়নেয়ার? তাদের সম্পদের উৎস কী? কর-রিটার্নের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য আছে কি? অবৈধ প্রভাব, চাঁদাবাজি বা রেন্ট-সিকিংয়ের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি?

এসব প্রশ্নের উত্তরই প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করবে।

রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন একই আইন শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের ক্ষেত্রেও হয় এবং বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। ব্যক্তি নয়, নীতিই যদি বিচারকের আসনে বসে—তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।
ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট। বিপ্লব তখনই সফল হয়, যখন তা কেবল সরকার বদলায় না; ক্ষমতার সংস্কৃতিও বদলে দেয়। আর যদি কেবল পুরোনো এলিটের জায়গায় নতুন এলিট বসে, তবে জনগণের বিজয় শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার করিডোরেই বন্দি হয়ে যায়।
. আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাকর দৈনিক কুষ্টিয়া ও কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net