August 31, 2026, 9:07 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
গাংনীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা মামলার মূল দুই অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেফতার জুলাই শহীদ ও গুমের শিকার পরিবারের আরও ৭৪ সদস্য পেলেন চাকরি চুয়াডাঙ্গায় অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘট, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন রুটে যাত্রী ভোগান্তি মেহেরপুরে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দুই শিক্ষকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে কুষ্টিয়ায় পদ্মাপাড়ে প্রশাসনের লাল পতাকা নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা-ভূমিধস: নিহত ১৭৭, নিখোঁজ ১,৩৮৪ মেহেরপুরে গভীর রাতে ঘরে ঢুকে যুবতীর কব্জি কেটে নিল যুবক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট/শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বাসস্থান ও ভবনের ব্যবহার নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছয় মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা/বন্ধ হয়েছে ৯৫ কারখানা, কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক সারের বরাদ্দ আছে, সংকট কোথায়?

মিনিকেট মিথ/প্রতারণার পালিশে হারিয়ে যাচ্ছে পুষ্টি (প্রথম পর্ব)

৷ ড. আমানুর আমান

(প্রথম পর্ব)
একটি জাতির সভ্যতা কেবল তার উঁচু দালান, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—তার নাগরিকরা কী খাচ্ছে এবং সেই খাদ্য কতটা নিরাপদ। কারণ খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; এটি মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি। যে রাষ্ট্র মানুষের প্রধান খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের দাবি সবসময়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাংলাদেশে চাল শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের অধিকাংশ মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার কেন্দ্রে রয়েছে এক মুঠো ভাত। তাই চালের গুণগত মান, পুষ্টি ও সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা শুধু বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বছরের পর বছর ধরে এই প্রধান খাদ্যকে ঘিরে এমন এক প্রতারণার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বাজারে গেলে আমরা নির্দ্বিধায় “মিনিকেট” চাল কিনি। অনেকেই মনে করেন, এটি কোনো উন্নত জাতের ধান থেকে উৎপাদিত বিশেষ মানের চাল। অথচ কৃষিবিজ্ঞানীরা বহুবার স্পষ্ট করেছেন—বাংলাদেশে “মিনিকেট” নামে কোনো স্বীকৃত ধানের জাত নেই। অর্থাৎ যে নামের ওপর ভরসা করে কোটি মানুষ চাল কিনছেন, সেই নামের বাস্তব অস্তিত্বই নেই।
প্রশ্ন হলো, একটি অস্তিত্বহীন নাম কীভাবে দেশের প্রতিটি বাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডে পরিণত হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বাজারে নয়; আমাদের তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতায়ও লুকিয়ে আছে।
বাস্তবে বিভিন্ন মোটা বা মাঝারি জাতের ধান কম দামে কিনে আধুনিক মিলে অতিরিক্ত ঘষামাজা ও পালিশ করে সরু, সাদা ও চকচকে করা হয়। এরপর সেই চালের গায়ে নতুন পরিচয় লাগিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়। অর্থাৎ পণ্যের প্রকৃত পরিচয় বদলে দিয়ে তৈরি করা হয় একটি নতুন বাজার।
এটি শুধু বিপণন কৌশল নয়; এটি ভোক্তার সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা।
একজন মানুষ যখন একটি নির্দিষ্ট নাম দেখে চাল কিনছেন, তখন তিনি ধরে নিচ্ছেন সেটিই সেই চালের প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু যদি সেই পরিচয়ই মিথ্যা হয়, তাহলে তিনি কেবল বেশি দামই দিচ্ছেন না, নিজের অজান্তেই প্রতারিতও হচ্ছেন।
এই প্রতারণার সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি অর্থনৈতিক নয়, স্বাস্থ্যগত।
চালের বাইরের স্তরে থাকে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, খাদ্যআঁশ, খনিজসহ বহু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। অতিরিক্ত পালিশের ফলে এসব উপাদানের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়লেও খাদ্যের প্রকৃত গুণগত মান কমে যায়। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে পুষ্টির চেয়ে রংকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়। চাল যত বেশি সাদা, সেটিকে তত বেশি ভালো বলে মনে করা হয়। অথচ বিজ্ঞানের ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

চকচকে চাল মানেই পুষ্টিকর চাল নয়/

বরং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পালিশ করা চাল শরীরের জন্য তুলনামূলক কম উপকারী। কিন্তু এই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। কারণ বাজারে বিজ্ঞাপন আছে, বিপণন আছে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সচেতনতা নেই।
আর এখানেই অসাধু ব্যবসায়ীদের সাফল্য।
তারা মানুষের খাদ্যাভ্যাস নয়, মানুষের মনস্তত্ত্বকে ব্যবসার পণ্য বানিয়েছে। মানুষ সাদা চাল পছন্দ করে—এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকেই তারা কোটি টাকার বাণিজ্যে পরিণত করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটি কোনো গোপন বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে বিষয়টি বলে আসছেন। সংবাদমাধ্যম একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এমনকি আইনও হয়েছে। কিন্তু বাজারের বাস্তবতা খুব বেশি বদলায়নি।
যেখানে আইনের উপস্থিতি কেবল কাগজে থাকে, সেখানে প্রতারণা ধীরে ধীরে ব্যবসার নিয়মে পরিণত হয়।
আর যখন মানুষের প্রধান খাদ্যই প্রতারণার শিকার হয়, তখন সেটি শুধু বাজারের ব্যর্থতা নয়; রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বেরও একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net