September 4, 2026, 9:13 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
(এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হরে)
সরকার দেশের শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে আলোচনায় আসছে কুষ্টিয়ার দীর্ঘ শিক্ষা-ঐতিহ্য। ব্রিটিশ আমল থেকে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে চলেছে। সরকারের জাতীয়করণ উদ্যোগে যোগ্য শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পেলে কুষ্টিয়ার এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।
সরকার বেসরকারি এমপিওভুক্ত অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর—মাউশি—দেশের শত বছরের পুরোনো স্কুল ও কলেজের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে মূল্যায়নের এই উদ্যোগকে কুষ্টিয়ার শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
কুষ্টিয়ার শিক্ষা ইতিহাসের শিকড় অনেক গভীরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই এ অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে। জেলার অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬১ সালে। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে যুক্ত।
শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, কুষ্টিয়া সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত একাধিক স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো একটি সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার আধুনিক শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও পুরোনো এসব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ গড়ে তোলার উত্তরাধিকার।
সরকারের নতুন উদ্যোগে এখন প্রশ্ন উঠেছে—কুষ্টিয়ায় শতবর্ষী এবং জাতীয়করণের শর্ত পূরণকারী এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান কয়টি? কোন প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে? আর সেগুলোর মধ্যে কোনগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা থাকা এলাকায় এখনো শিক্ষার্থীদের প্রধান ভরসা?
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির উদ্যোগ কেবল জাতীয়করণের সম্ভাব্য তালিকা তৈরির কাজ নয়; এর মাধ্যমে একটি জেলার শিক্ষা ইতিহাসও নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিওভুক্ত হলেও অবকাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভেদে পার্থক্য রয়েছে। যোগ্য ও প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আওতায় এলে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীরা আরও শক্তিশালী সরকারি শিক্ষা অবকাঠামোর সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শুধু শতবর্ষ পূর্ণ করাই কোনো প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের একমাত্র শর্ত নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিষ্ঠানটির এমপিওভুক্তি, অনুমোদিত শিক্ষক-কর্মচারীর কাঠামো, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষার ফলাফল, ভৌগোলিক প্রয়োজনীয়তা এবং ওই এলাকায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এ কারণে কুষ্টিয়ার শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়, বর্তমান শিক্ষাগত ভূমিকা ও এলাকার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জেলার শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তাদের প্রতিষ্ঠাকাল, শিক্ষার্থী সংখ্যা, ফলাফল, অবকাঠামো এবং এলাকার শিক্ষা বিস্তারে অবদান মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এতে সরকারের জাতীয় উদ্যোগের সঙ্গে কুষ্টিয়ার বাস্তব চাহিদা ও সম্ভাবনাকে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় সরকারি স্কুল বা কলেজের সংখ্যা সীমিত, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ও সফলভাবে পরিচালিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের আওতায় এলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ আরও বাড়বে।
কুষ্টিয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য পরিচিত এই জেলায় শিক্ষা বিস্তারেরও রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলার সামাজিক পরিবর্তন, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ এবং বহু প্রজন্মের মানুষের স্মৃতি।
তাই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয়করণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কুষ্টিয়ার জন্য এটি শুধু নতুন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনা তৈরি করবে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পথও তৈরি করতে পারে।
এখন প্রয়োজন কুষ্টিয়ার শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করা। সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সেই তালিকা যুক্ত হলে কুষ্টিয়ার দেড়শ বছরের শিক্ষা-ঐতিহ্যের নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।