October 9, 2026, 5:08 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
খুলনা বিভাগের মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ কিছুটা বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে উত্তরাঞ্চলের জেলা রংপুরে রোগটির বিস্তার ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলতি বছর অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৪১৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ৫৪ জন এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে অসুস্থ বা আক্রান্ত গবাদিপশু জবাই করা এবং এসব পশুর মাংস নাড়াচাড়া বা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সেখানে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬ হাজার ২৯৬ জন। এর মধ্যে চলতি বছরই চিকিৎসা নিয়েছেন ৪১৩ জন। গত তিন মাসে ১৩২ জন এবং চলতি মাসে ২৬ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে গাংনীতে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে সর্বোচ্চ ৭৯৩ জন চিকিৎসা নেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬৮৬ এবং ২০২৫ সালে ৬০৭। এর আগে ২০১৯ সালে ৬৬০ এবং ২০২২ সালে ৬৪৪ জন রোগী চিকিৎসা নেন।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ইসতিয়াক আহমেদ মাসুদ বলেন, আক্রান্ত গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া থেকে মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়াতে পারে। আক্রান্ত রোগীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরেও অ্যানথ্রাক্সের রোগী বেড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ৩০ জন এবং ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ২৪ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। দুই মাসে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। তবে এ রোগে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, শুধু সাম্প্রতিক সময়ে নয়, উপজেলায় সারা বছরই অ্যানথ্রাক্সের রোগী পাওয়া যায়। আক্রান্তদের অধিকাংশই বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠছেন।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, জেলাজুড়ে কোনো মহামারি পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে দৌলতপুরে সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি। মিরপুর, ভেড়ামারা ও কুমারখালী থেকেও বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে ওই তিন উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স রোগী পাওয়ার তথ্য নেই।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব জানান, উপজেলায় তিন লাখের বেশি গবাদিপশু রয়েছে। অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম চলছে।
তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে অসুস্থ পশু গোপনে জবাই করে মাংস বিক্রির প্রবণতা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কুষ্টিয়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আল মামুন হোসেন মণ্ডল বলেন, জেলায় আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় লাখ গরু-মহিষ এবং প্রায় ১০ লাখ ছাগল-ভেড়া রয়েছে। অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, অ্যানথ্রাক্স মূলত গবাদিপশুর রোগ হলেও আক্রান্ত পশু জবাই, মাংস কাটাকাটি বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এর জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে অসুস্থ বা আকস্মিকভাবে মারা যাওয়া গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই বা এসব পশুর মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের রংপুরেও অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নে চলতি মাসের শুরুতে তিনজনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হয়।
এরপর স্থানীয় স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ সচেতনতামূলক সভা এবং গবাদিপশুর টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করেছে।
রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. ফিরোজ হাসান খান বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিরা দ্রুত চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহা. নাজমুল হুদা বলেন, অ্যানথ্রাক্স একটি মাটিবাহিত রোগ এবং আক্রান্ত এলাকায় এর জীবাণু দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। রোগটি প্রতিরোধে টিকাদানের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত পশু দ্রুত শনাক্ত করা, অসুস্থ বা আকস্মিকভাবে মারা যাওয়া পশু জবাই না করা এবং গবাদিপশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মধ্যে রোগের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।