February 16, 2026, 12:22 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটার পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় ১৮ মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে, এবং নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে শপথের মধ্য দিয়ে নতুন প্রশাসনিক অধ্যায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বকেয়ার চাপ/
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই তারেক রহমান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। একইভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করেছেন—নতুন সরকারকে বহুমুখী চাপের মধ্যে অর্থনীতি পরিচালনা করতে হবে।
সমালোচকদের মতে, বিদায়ী প্রশাসন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বকেয়া দায়, চলমান অর্থসংকট এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা রেখে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া বিল, ভর্তুকির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বাজারব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে Adani, Summit ও S Alam–এর কাছে উল্লেখযোগ্য বকেয়া থাকার বিষয়টি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রমজান, বাজার ও জ্বালানি—তাৎক্ষণিক বাস্তবতা/
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রমজান মাস শুরু হওয়ায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার তদারকি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে। মূল্যস্ফীতি, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য—এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে জনঅসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সময়ে বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর কৃষি উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়বে। জ্বালানি ঘাটতি বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে—যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকিতে ফেলবে।
উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ ও আর্থিক দায়/
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিপুলসংখ্যক নিয়োগ ও শত শত উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয়সম্পন্ন এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, নির্বাচিত সরকারের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি করে বিদায়ী প্রশাসন দায়িত্ব হস্তান্তর করছে।
এদিকে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা–সম্পর্কিত কর্মীদের বেতন বকেয়া থাকার তথ্যও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। ফলে নতুন সরকারকে একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি, ব্যয়চাপ ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার—তিনটি ক্ষেত্রেই কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
আস্থার পরীক্ষায় নতুন সরকার/
ব্যবসায়ী মহলের একাংশের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি; ফলে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হবে আস্থা পুনর্গঠন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করবে আগামীর অর্থনৈতিক স্থিতি।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সময়ের অসমাপ্ত সংকট, আর্থিক দায় এবং কাঠামোগত দুর্বলতার ভার নিয়েই নতুন সরকার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়—তার ওপরই নির্ধারিত হবে নতুন প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকনির্দেশ।