June 28, 2026, 6:10 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ক্রমাগত রাজস্ব ঘাটতি, টিকিটবিহীন যাত্রী, জনবল সংকট এবং লোকসানি মেইল ও লোকাল ট্রেন পরিচালনার ব্যয় সামাল দিতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে আরও ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে অনুমোদনের জন্য রেলওয়ে সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এ উদ্যোগে রাজস্ব বাড়লেও যাত্রীভাড়া বৃদ্ধি এবং নিম্নআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ জানান, অনুমোদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ট্রেনগুলো ইজারা দেওয়া হবে। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই মেইল ও লোকাল ট্রেন পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য লোকসান হচ্ছে। এ কারণে রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে বিকল্প ব্যবস্থাপনা হিসেবে বেসরকারি অপারেটরের মাধ্যমে ট্রেন পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলে ৬২টি আন্তঃনগর, ৫৫টি মেইল ও কমিউটার এবং ১২টি লোকাল ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে ২৪টি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন ইতোমধ্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এসব ট্রেন থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আরও ১১টি ট্রেন ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে রাজস্ব সংকটের পেছনে শুধু লোকসানি ট্রেন নয়, আরও কয়েকটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, পশ্চিমাঞ্চলের মাত্র ১০ থেকে ১২টি আন্তঃনগর ট্রেন নিয়মিত লাভজনক। অন্যদিকে অধিকাংশ মেইল ও লোকাল ট্রেন কম ভাড়া, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং ব্যাপক টিকিট ফাঁকির কারণে লোকসানে পরিচালিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে টিকিটবিহীন যাত্রী ও অনিয়ম। স্থানীয় রুটে অনেক যাত্রী টিকিট ছাড়াই ভ্রমণ করেন। আবার অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ কাউন্টার থেকে টিকিট না কেটে ট্রেনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অর্থ দিয়ে যাতায়াত করেন। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আনসার আলী বলেন, কার্যকরভাবে টিকিট পরীক্ষা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
রাজস্ব আদায়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৬৪৯ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকার লক্ষ্য থাকলেও আয় নেমে আসে ৬২১ কোটতে। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই ৮২৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৫৬৬ কোটি টাকা। ধারাবাহিক এ ঘাটতি রেলওয়ের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রেল কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, তদারকি বৃদ্ধি এবং পৃথকভাবে প্রতিটি ট্রেনের লাভ-লোকসানের হিসাব সংরক্ষণ করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। কিন্তু জনবল ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে আপাতত ইজারা পদ্ধতিকেই তুলনামূলক কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ট্রেন ইজারা দিলেই রাজস্ব সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। টিকিট ফাঁকি বন্ধে কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর মতো কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাত্রীসেবার মান ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর তদারকি না থাকলে সাধারণ যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।