July 6, 2026, 2:58 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের এই সময়ে ব্যক্তি উদ্যোগে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রকৌশলী টুটুল। পেশায় একজন প্রকৌশলী হলেও সমাজে তিনি পরিচিত একজন নিবেদিতপ্রাণ গাছপ্রেমী ও পরিবেশকর্মী হিসেবে। সরকারি চাকরির পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্থায়নে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে এ পর্যন্ত প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করেছেন তিনি। এখন তাঁর লক্ষ্য, জীবদ্দশায় ২০ লাখ গাছের চারা মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া।
১৯৯৫ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই পরিবেশ রক্ষাকে নিজের জীবনের অন্যতম অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করেন প্রকৌশলী টুটুল। সে সময় পরিবেশ সংরক্ষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা বর্তমানের মতো ব্যাপক ছিল না। তবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, প্রকৃতিকে রক্ষা করতে না পারলে মানুষের ভবিষ্যৎও নিরাপদ থাকবে না। সেই উপলব্ধি থেকেই সীমিত বেতনের মধ্য থেকে নিয়মিত অর্থ সঞ্চয় করে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা কিনতে শুরু করেন এবং দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে বিতরণ করেন।
গাছ বিতরণের পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কেও সচেতন করে তোলেন। তাঁর ভাষায়, একটি গাছ শুধু অক্সিজেনের উৎস নয়; এটি বৃষ্টিপাত, জীববৈচিত্র্য, মাটির উর্বরতা, নদী ও কৃষি রক্ষার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি গাছ রোপণ মানে একটি ছোট্ট পরিবেশব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবীর ভিত্তি নির্মাণ।
এই উদ্যোগের জন্য তাঁকে কম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। সরকারি দায়িত্ব পালনের পর রাত জেগে বাড়ির নকশা ও ডিজাইনের অতিরিক্ত কাজ করে যে আয় হতো, তার বড় অংশই ব্যয় করতেন গাছের চারা কেনার পেছনে। অনেক সময় ব্যক্তিগত চাহিদা ও পারিবারিক ব্যয় সীমিত রেখে পরিবেশ রক্ষার এই উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর কাছে গাছ লাগানো কোনো শখ নয়; এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব।
তাঁর এই দীর্ঘ অভিযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মানুষের ভালোবাসা ও স্বীকৃতি। বহু বছর আগে যেসব শিক্ষার্থীর হাতে তিনি একটি করে চারা তুলে দিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ পরবর্তীকালে সেই গাছের প্রথম ফল নিয়ে তাঁর কাছে ফিরে এসেছে। এমন মুহূর্তকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান বলে মনে করেন। তাঁর মতে, কোনো পদক বা আনুষ্ঠানিক সম্মাননার চেয়েও একজন মানুষের হাতে রোপণ করা গাছের ফল ফিরে পাওয়া অনেক বেশি মূল্যবান।
পরিবেশ রক্ষার এই অভিযানে এখন তাঁর পরিবারের নতুন প্রজন্মও যুক্ত হয়েছে। ছেলে সাকিব বাবার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত কাজে যান। তাঁদের গাড়িতে নকশার ফাইলের পাশাপাশি থাকে অসংখ্য গাছের চারা। কাজ শেষে আশপাশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে চারা তুলে দেন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা পৌঁছে দেন। তাঁদের বিশ্বাস, একটি শিশুর হাতে একটি গাছ তুলে দিলে তার মনে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে একটি সচেতন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।
প্রকৌশলী টুটুল মনে করেন, পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য। তাই তিনি চান, দেশের প্রতিটি শিশু অন্তত একটি করে গাছ লাগাক এবং প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত একটি বৃক্ষ রোপণ করুক। তাঁর স্বপ্ন, এভাবেই একদিন বাংলাদেশ আরও সবুজ, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য দেশে পরিণত হবে।
কোনো প্রচার, পুরস্কার বা ব্যক্তিগত স্বীকৃতির প্রত্যাশায় নয়, বরং মানবকল্যাণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ার প্রত্যয়ে তিনি কাজ করে চলেছেন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষ একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তার লাগানো গাছ বহু বছর ধরে ছায়া, ফল, অক্সিজেন ও জীবনের বার্তা দিয়ে যাবে। সেই বিশ্বাস থেকেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সচেতনতার এই সামাজিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রকৌশলী টুটুল।