September 28, 2026, 2:51 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
কুষ্টিয়ার ১৬ জন/সুপারিশের পরও নিয়োগ বাতিল, ভেরিফিকেশন ঘিরে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নতুন জটিলতা কুষ্টিয়ায় মসজিদের ব্যাটারি চুরি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, নিহত ১ চুয়াডাঙ্গা/ লাইসেন্স নেই বিক্রয় করছিলেন সার, ৪০৩ বস্তা সরকারি ডিএপি সার জব্দ জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: সংঘাত নিরসনে আলোচনার আহ্বান ব্ল্যাক সি সংকটে আবারও ভারতের গমে ফিরছে বাংলাদেশ, কেজিতে খরচ প্রায় ৩৮-৪০ টাকা কুষ্টিয়া যুবদলের নতুন কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে বুধবার আনন্দ মিছিল বিশ্লেষণ/বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে কেন বাড়ল পদ্মার অববাহিকায় ইলিশের আকাল, হাহাকার জেলেদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার হাব স্থাপনের লক্ষ্যে ব্র্যাকের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃবিভাগ ও আন্তঃহল ফুটবল টুর্নামেন্ট উদ্বোধন

শতাব্দীর প্রথম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, খুলে গেল সূর্যের রহস্যের জানালা, বাংলাদেশ কেন বঞ্চিত হলো

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দুপুরের আকাশ হঠাৎ গোধূলির মতো অন্ধকার। সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে একসময় দেখা গেল শুধু কালো চাঁদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ম্লান সাদা আলোর মুকুট। ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে বুধবার এমনই এক বিরল মহাজাগতিক দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে লাখো মানুষ। ১২ আগস্টের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণকে ঘিরে স্পেন, আইসল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। এটিই ছিল ইউরোপে এই শতাব্দীর প্রথম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।
বাংলাদেশ থেকে অবশ্য এই মহাজাগতিক নাটকের কোনো পর্যায়ই খালি চোখে দেখা যায়নি। কারণ গ্রহণের ছায়াপথ ছিল উত্তর গোলার্ধের অনেক উত্তরে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, চাঁদের পূর্ণ ছায়া বা ‘পাথ অব টোটালিটি’ অতিক্রম করেছে উত্তর রাশিয়ার অংশ, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর স্পেন ও পর্তুগালের একটি ছোট অংশ। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা গেছে আংশিক গ্রহণ।

চাঁদের ছায়ায় কয়েক মিনিটের জন্য হারিয়ে গেল সূর্য

সূর্যগ্রহণের মূল কারণ পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের একটি বিশেষ সরলরৈখিক অবস্থান। চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে এবং তার ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে, তখন সূর্যের আলো আংশিক বা পুরোপুরি ঢেকে যায়। যে সরু অঞ্চলে চাঁদের গাঢ় ছায়া পড়ে, সেখান থেকেই পূর্ণগ্রাস দেখা যায়।

এবার সেই ছায়া প্রথমে উত্তর মেরু ঘেঁষা অঞ্চল দিয়ে এগিয়ে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডে পৌঁছায়। এরপর উত্তর আটলান্টিক পেরিয়ে তা স্পেনের উত্তরাঞ্চল ও পর্তুগালের একটি অংশে প্রবেশ করে। পুরো গ্রহণের পথ ছিল হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ, কিন্তু পূর্ণগ্রাসের প্রকৃত অঞ্চল ছিল তুলনামূলকভাবে সরু।

পূর্ণগ্রাসের সর্বোচ্চ স্থায়িত্ব ছিল ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থান থেকে কতক্ষণ পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে, তা নির্ভর করেছে সেই স্থানের ওপর। রেইকিয়াভিকে পূর্ণগ্রাস স্থায়ী হয়েছে প্রায় ১ মিনিট ১ সেকেন্ড; সেখানে পুরো গ্রহণের আংশিক পর্যায় মিলিয়ে ঘটনাটি চলেছে প্রায় দুই ঘণ্টা।

আইসল্যান্ডে ৭২ বছর পর, রেইকিয়াভিকে প্রায় ৬০০ বছর পর

আইসল্যান্ডবাসীর কাছে এবারের গ্রহণ ছিল বিশেষ ঐতিহাসিক। দেশটির কোথাও শেষবার পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল ১৯৫৪ সালে। আর রাজধানী রেইকিয়াভিকে সর্বশেষ পূর্ণগ্রাস দেখা গিয়েছিল ১৪৩৩ সালে—অর্থাৎ প্রায় ছয় শতাব্দী আগে। পরবর্তীবার আইসল্যান্ডে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ২১৯৬ সালে।

তাই শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানী নয়, সাধারণ মানুষও দীর্ঘদিন ধরে এ দিনের অপেক্ষায় ছিলেন। তবে প্রকৃতিও শেষ মুহূর্তে বড় পরীক্ষা নিয়েছে। আইসল্যান্ডের কিছু এলাকায় মেঘের কারণে গ্রহণের দৃশ্য আড়াল হয়ে যায়। রেইকিয়াভিকেও আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন, যদিও পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জায়গায় তুলনামূলক পরিষ্কার আকাশে গ্রহণ দেখা সম্ভব হয়েছে।

স্পেনে সূর্যগ্রহণ দেখল লাখো মানুষ

গ্রহণের শেষ বড় স্থলভাগ ছিল স্পেন। উত্তর স্পেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পূর্ণগ্রাসের পথের মধ্যে পড়ায় সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। লেওন, বিলবাও, জারাগোজা, ভ্যালেন্সিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র তৈরি করা হয়।

স্পেনে এবারের ঘটনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মূল ভূখণ্ডে এমন পূর্ণগ্রাস বহু দশক পর দেখা গেল। দেশটির উত্তরাঞ্চলে সূর্য যখন চাঁদের আড়ালে চলে যায়, দিনের আলো মুহূর্তেই অস্বাভাবিকভাবে কমে আসে। কোথাও কোথাও সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়েও গ্রহণ চলতে থাকে। নাসার হিসাব অনুযায়ী, লেওনে স্থানীয় সময় রাত ৮টা ২৮ মিনিটে পূর্ণগ্রাস শুরু হয়ে ৮টা ৩০ মিনিটে শেষ হয়; ভ্যালেন্সিয়ায় পূর্ণগ্রাস শুরু হয় ৮টা ৩২ মিনিটে।

এই অস্বাভাবিক আলো-অন্ধকারের পরিবর্তন শুধু মানুষের চোখেই ধরা পড়ে না। গ্রহণের সময় পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে, বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং স্থানীয়ভাবে বিশেষ ধরনের ‘eclipse wind’ বা গ্রহণজনিত বায়ুপ্রবাহের ঘটনাও গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞানীদের কাছে কয়েক মিনিটই মূল্যবান

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব এখানেই। স্বাভাবিক সময়ে সূর্যের অতি উজ্জ্বল আলোর কারণে তার বাইরের বায়ুমণ্ডল—করোনা—সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। কিন্তু চাঁদ যখন সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ পুরোপুরি ঢেকে দেয়, তখন করোনার মৃদু সাদা আলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই করোনা শুধু একটি সুন্দর আলোর বলয় নয়। এটি সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্র, উত্তপ্ত প্লাজমা, সৌরবায়ু এবং মহাকাশ আবহাওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। করোনার গঠন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্র কীভাবে কাজ করছে এবং সৌরবায়ু কীভাবে উৎপন্ন ও বিস্তৃত হচ্ছে—এসব বিষয়ে তথ্য পান। পূর্ণগ্রাসের সময় তোলা করোনার ছবিও সৌর চৌম্বক ক্ষেত্রের গঠন বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এবারের গ্রহণকে ঘিরেও বিজ্ঞানীরা আগেই করোনার সম্ভাব্য গঠন মডেল করেছিলেন। স্যাটেলাইট ও স্থলভিত্তিক পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে সূর্যের করোনার ত্রিমাত্রিক কাঠামো অনুমান করা হয়েছিল। গ্রহণের বাস্তব ছবি ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সেই পূর্বাভাস মিলিয়ে দেখা সৌর পদার্থবিদ্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ কেন বঞ্চিত হলো?

সূর্যগ্রহণ পৃথিবীর সর্বত্র একসঙ্গে একইভাবে দেখা যায় না। পৃথিবীর তুলনায় চাঁদ ছোট হওয়ায় তার পূর্ণ ছায়া পৃথিবীর খুব সীমিত একটি অঞ্চলের ওপর পড়ে। ফলে কোনো একটি পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময় বিশ্বের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হয় আংশিক গ্রহণ দেখেন, নয়তো কিছুই দেখতে পান না।

এবারের গ্রহণের পূর্ণগ্রাসের পথ উত্তর গোলার্ধের অনেক উত্তরে থাকায় বাংলাদেশ সেই অঞ্চলের বাইরে ছিল। নাসার মানচিত্রে বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পূর্ণগ্রাসের দৃশ্যমান এলাকার মধ্যে নেই।

অর্থাৎ গ্রহণের ঘটনা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও ঘটলেও বাংলাদেশে তখন সূর্যের ওপর চাঁদের ছায়া পড়ার দৃশ্যমান কোনো পর্যায় তৈরি হয়নি। তাই দেশের আকাশে তাকিয়ে এ গ্রহণ দেখার সুযোগ ছিল না।

‘শতাব্দীর সেরা’ কেন বলা হচ্ছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে এবারের গ্রহণকে কোথাও কোথাও ‘শতাব্দীর সেরা’ বলা হয়েছে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এর চেয়ে নির্দিষ্ট বর্ণনা হলো—এটি ২১ শতকে ইউরোপে দৃশ্যমান প্রথম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।

গ্রহণটির বিশেষত্ব শুধু এর পূর্ণগ্রাস হওয়ার মধ্যে নয়। এর পথ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও ইউরোপের জনবহুল অংশের ওপর দিয়ে গেছে। ফলে একই মহাজাগতিক ঘটনাকে বিজ্ঞানী, পর্যটক, ফটোগ্রাফার এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন।

দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে উত্তর আমেরিকায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ নিয়ে যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের গ্রহণ ইউরোপে তারই আরেকটি বড় অধ্যায় হয়ে উঠল। তবে এবারের গ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি অপেক্ষাও শুরু হয়েছে—কারণ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের এই স্বল্পস্থায়ী অন্ধকার আবার কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে ফিরতে বহু বছর লেগে যেতে পারে।

চাঁদ প্রতি মাসেই পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে আসে, কিন্তু প্রতি মাসে সূর্যগ্রহণ হয় না। পৃথিবীর কক্ষপথ, চাঁদের কক্ষপথের হেলন এবং তিনটি মহাজাগতিক বস্তুর সুনির্দিষ্ট অবস্থানের মিলনেই তৈরি হয় এই বিরল দৃশ্য। সেই কারণেই কয়েক মিনিটের জন্য সূর্য হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি মানুষের কাছে যেমন বিস্ময়ের, বিজ্ঞানীদের কাছেও তেমনি কয়েক মিনিটের একটি অমূল্য গবেষণাগার।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net