August 19, 2026, 5:41 pm

ড. আমানুর আমান/
পেঁয়াজের ন্যায্য দাম না পাওয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষত শুকানোর আগেই কৃষকের সামনে হাজির হয়েছে নতুন সংকট—বিদ্যুৎ। বাজারে দাম পড়ে গেলে কৃষক লোকসানে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন; আর দাম বাড়ার আশায় সেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে গেলে এখন বিদ্যুৎ সংকটে কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষণব্যবস্থার প্রাণ—এয়ার ফ্লো মেশিন। ফলে যে প্রযুক্তিকে কৃষকের ফসল রক্ষার সমাধান হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক জায়গায় সেটিই প্রত্যাশিত ফল দিতে পারছে না।
দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদন অঞ্চল পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, মানিকগঞ্জ ও মেহেরপুরের সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, সমস্যাটি আর শুধু ‘পেঁয়াজ বেশি উৎপাদন হচ্ছে কি না’—এই সরল প্রশ্নে আটকে নেই। উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ছে না; সংরক্ষণ প্রযুক্তি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই প্রযুক্তি সচল রাখার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না; আর বাজারে যখন সরবরাহ কমে যায়, তখন সেই একই পেঁয়াজের দাম ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যায়। অর্থাৎ কৃষকের লোকসান এবং ভোক্তার বাড়তি দাম—দুটিই একই দুর্বল ব্যবস্থাপনার ভিন্ন প্রান্তের ফল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টন। অর্থাৎ দেশের পেঁয়াজ উৎপাদন সক্ষমতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই আর কৃষকের আয় বা বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে না।
পাবনায় এবার জেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ৫৪ হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৩৬৭ টন। কিন্তু রেকর্ড উৎপাদন কৃষকের ঘরে রেকর্ড আয় আনেনি। বরং উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক সময় নেমে গেছে বিপজ্জনক পর্যায়ে। প্রধান উৎপাদন এলাকাগুলোতে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে আনুমানিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। অথচ কোনো কোনো সময়ে মাঠপর্যায়ে তা বিক্রি করতে হয়েছে ৬০০ টাকা মণেও। অতিরিক্ত সরবরাহের সঙ্গে বৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ফরিদপুরেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫–২৬ মৌসুমে ৪৭ হাজার ৩৬ হেক্টর জমি থেকে জেলায় ৭ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৫ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে, আগের মৌসুমের ৫ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৯ টনের তুলনায় যা অনেক বেশি। কিন্তু কৃষক যখন এই বাড়তি উৎপাদন ধরে রেখে ভালো দামের অপেক্ষা করতে চেয়েছেন, তখন সামনে এসেছে গরম, বৃষ্টি এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সম্মিলিত ঝুঁকি।
সালথা ও নগরকান্দার কৃষকদের অভিজ্ঞতা এই সংকটের নির্মম দিকটি স্পষ্ট করে। বাড়ি কিংবা সরকারি সহায়তায় তৈরি সংরক্ষণব্যবস্থায় পেঁয়াজ রেখে তারা যখন বাজারদর ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষা করছেন, তখন বিদ্যুৎ না থাকায় সংরক্ষণব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করছে না। অর্থাৎ কৃষককে যে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে—‘এখন বিক্রি না করে সংরক্ষণ করুন’—তার বাস্তব অবকাঠামো কি আদৌ তার হাতে আছে?
এপ্রিলেই পাবনা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর কৃষকেরা জানিয়েছিলেন, আগের বছরের তুলনায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে প্রতি মণে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমে যায়। তখন কৃষকের সামনে দুটি পথ ছিল—লোকসানে বিক্রি করা, অথবা পেঁয়াজ রেখে দিয়ে ভবিষ্যতে দাম বাড়ার অপেক্ষা করা। দ্বিতীয় পথটি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত হলেও অবকাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
এখানেই বাংলাদেশের পেঁয়াজ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি ধরা পড়ে। ফসল ওঠার সময় বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম পড়ে যায়। কৃষক যদি কম দামে বিক্রি না করে সংরক্ষণ করেন, পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও বিদ্যুৎ না থাকায় পেঁয়াজ পচে যায়। পরে পচন, অপচয় ও মৌসুমি ঘাটতির কারণে বাজারে সরবরাহ কমে গেলে দাম আবার বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদক কম দাম পান, ভোক্তা বেশি দাম দেন—মাঝখানে নষ্ট হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ খাদ্য।
জুলাইয়ের বাজারচিত্র তারই প্রমাণ। ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর পাইকারি বাজারে মাঝামাঝি জুলাইয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও পরে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় ওঠে। পচন, অতিবৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত সংরক্ষণের কারণে মজুত কমে যাওয়ায় সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। একই সময়ে খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম ৩৫–৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ৫০–৬০ টাকা কেজিতে ওঠে।
অর্থাৎ যে পেঁয়াজ কৃষককে কখনো ২০–২৫ টাকার কাছাকাছি কেজিপ্রতি দরে বিক্রি করতে বাধ্য করে, সেই পেঁয়াজই কয়েক সপ্তাহ পর ভোক্তাকে ৫০–৬০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়। এই ব্যবধানকে শুধু ‘বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা’ বলে পাশ কাটানো যায় না। এর মধ্যে রয়েছে সংরক্ষণ ব্যর্থতা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কৃষকের দর-কষাকষির সীমিত ক্ষমতা।
মানিকগঞ্জের পরিস্থিতি সমস্যাটির আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর সামনে এনেছে। হরিরামপুর, শিবালয় ও ঘিওর উপজেলার প্রায় ৪৫০ কৃষককে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মেশিন নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। ফলে সংরক্ষণাগারে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হচ্ছে এবং পেঁয়াজে দ্রুত পচন ধরছে।
এখানেই বিদ্যুৎ সংকটের দায়টি আলাদা করে দেখা জরুরি। পেঁয়াজ পচে যাওয়ার জন্য সব দায় বিদ্যুৎকে দেওয়া ঠিক হবে না; সংরক্ষণাগারের নকশা, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, পেঁয়াজের মান, বৃষ্টির প্রভাব এবং ব্যবস্থাপনারও ভূমিকা আছে। কিন্তু যদি এয়ার ফ্লো প্রযুক্তির কার্যকারিতাই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর, তাহলে বিদ্যুৎ সরবরাহকে প্রকল্পের বাইরের কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এয়ার ফ্লো মেশিন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মেশিন চালানোর মতো বিদ্যুৎ নেই—এটি নিছক সমন্বয়হীনতা নয়; এটি কৃষি অবকাঠামো পরিকল্পনার মৌলিক দুর্বলতা।
মেহেরপুর থেকেও একই ধরনের উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে। মুজিবনগর উপজেলায় সরকারি সহায়তায় বিতরণ করা এয়ার ফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংরক্ষিত পেঁয়াজ পচে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মেহেরপুরে ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার পর তার কার্যকারিতা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
সরকার অবশ্য সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাইয়ে সংসদে জানানো হয়, প্রধান উৎপাদন এলাকাগুলোতে প্রায় ৯০০ মডেল সংরক্ষণাগার তৈরি করা হয়েছে এবং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। পরে ২৩ জুলাই কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আরও ১৫ হাজার এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের ঘোষণা দেন। ১৬ জেলার ১০৭টি উপজেলায় চলমান প্রকল্পে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৭০০টি মেশিন স্থাপন এবং ৩ হাজার ৯০০ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
সরকারের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য যৌক্তিক। দেশে উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও সংরক্ষণ ঘাটতির কারণে প্রতিবছর পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো তাই অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু মেশিনের সংখ্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।
কারণ একটি এয়ার ফ্লো মেশিন শুধু একটি যন্ত্র নয়; এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, সংরক্ষণাগারের কাঠামো, তাপমাত্রা-আর্দ্রতা ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত ব্যবহারকারী, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত তদারকির একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা যুক্ত। সেই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যদি বিদ্যুৎ সংকটে অচল থাকে, তাহলে কোটি কোটি টাকার প্রযুক্তি মাঠে থেকেও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
এখানেই নীতিনির্ধারণে একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার। পেঁয়াজকে শুধু কৃষিপণ্য হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি সংরক্ষণনির্ভর কৃষিপণ্য। উৎপাদনের পর তার জীবন রক্ষার জন্য বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো প্রয়োজন। তাই কৃষকের জন্য ভর্তুকি, বীজ বা প্রযুক্তি বিতরণের পাশাপাশি উৎপাদন অঞ্চলের সংরক্ষণকেন্দ্রগুলোকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনা জরুরি। প্রয়োজনে এসব কেন্দ্রকে কৃষি-সংরক্ষণ ‘অগ্রাধিকার লোড’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাকআপ বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ বা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা দরকার।
সাত জেলার মাঠপর্যায়ের চিত্রে তাই একটি কঠিন সত্য স্পষ্ট: বাংলাদেশের পেঁয়াজ সংকট উৎপাদনের ঘাটতির চেয়ে ব্যবস্থাপনার সংকট বেশি। কৃষক উৎপাদন করছেন, কিন্তু ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। সংরক্ষণ করছেন, কিন্তু পেঁয়াজ রক্ষা করতে পারছেন না। প্রযুক্তি পাচ্ছেন, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় তা চালাতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত কৃষকের পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে, আর বাজারে সরবরাহ কমে ভোক্তার দাম বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় পেঁয়াজ আমদানি কমানো কিংবা শূন্যে নামানোর লক্ষ্য কেবল উৎপাদন বাড়িয়ে অর্জন করা যাবে না। ক্ষেত থেকে সংরক্ষণাগার, সংরক্ষণাগার থেকে বাজার—পুরো শৃঙ্খলটিকে কার্যকর করতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংকটকে যদি কৃষি সংরক্ষণ অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা না করা হয়, তাহলে এয়ার ফ্লো মেশিনের সংখ্যা ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার কিংবা তারও বেশি করা হলেও কৃষকের পচা পেঁয়াজের স্তূপ কমবে না।
কৃষকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই এখন শুধু ‘পেঁয়াজের দাম কত?’ নয়। প্রশ্ন হলো—যে পেঁয়াজ তিনি উৎপাদন করেছেন, সেটি বাজারে ভালো দাম না পাওয়া পর্যন্ত নিরাপদে রাখার নিশ্চয়তা কি রাষ্ট্র দিতে পারছে?
এই নিশ্চয়তা না থাকলে রেকর্ড উৎপাদনও কৃষকের জন্য সাফল্য নয়। বরং তা হয়ে উঠতে পারে আরও বড় লোকসানের পূর্বাভাস। আর বিদ্যুৎ সংকটে এয়ার ফ্লো মেশিন বন্ধ রেখে সেই লোকসানের দায় কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে তা শুধু বাজারের ব্যর্থতা নয়—কৃষি নীতিরও এক গভীর বৈপরীত্যের প্রকাশ।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস।