October 30, 2026, 5:37 pm

প্রথম ইউনিটে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি, নভেম্বরে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সম্ভাবনা
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরে প্রাথমিক জ্বালানি লোডিংয়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জ্বালানির প্রথম চালান সরবরাহ করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রসাটম। একই সঙ্গে প্রথম ইউনিটের প্রথমবারের জ্বালানি পুনঃস্থাপন বা রিফুয়েলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন জ্বালানিও বাংলাদেশে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে আরও এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) ২৯ অক্টোবর ইউনিটটির পরবর্তী পর্যায়ের কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন দিয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হলে আগামী নভেম্বরেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। ফলে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট সচল করার প্রস্তুতি একসঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রসাটমের বাংলাদেশে নিযুক্ত জনসংযোগ বিভাগের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিংয়ের জ্বালানি পৌঁছানোর তথ্য জানানো হয়।
রসাটমের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে প্রাথমিকভাবে ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি পারমাণবিক জ্বালানি অ্যাসেম্বলিগুলো রসাটমের জ্বালানি বিভাগের অধীন সাইবেরিয়ার নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেন্ট্রেটস প্ল্যান্টে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে এসব জ্বালানি বাংলাদেশে আনা হয়। অন্যদিকে, প্রথম ইউনিটের নির্ধারিত প্রথম জ্বালানি চক্র শেষে পুনরায় জ্বালানি সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন জ্বালানিও সাইবেরিয়া থেকে আনা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর পর জ্বালানিভর্তি বিশেষ কনটেইনারগুলো নির্ধারিত সুরক্ষিত সংরক্ষণাগারে রাখা হয়েছে। রিঅ্যাক্টরে ব্যবহারের আগে প্রতিটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলির চাক্ষুষ পরীক্ষা ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রের মাধ্যমে কারিগরি পরীক্ষা করা হবে। বাংলাদেশি গ্রাহকপক্ষ, প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং জ্বালানি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমিশন এসব পরীক্ষা ও যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ ক্ষেত্রে পারমাণবিক ও বিকিরণ নিরাপত্তার নির্ধারিত বিধিবিধান অনুসরণ করা হবে।
প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে
রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিট ইতোমধ্যে জ্বালানি লোডিং ও প্রাথমিক কমিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে। চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল রিঅ্যাক্টরে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। ১২ মে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপনের মাধ্যমে প্রাথমিক জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়। এরপর ধারাবাহিক পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার যাচাই শেষে অক্টোবরে রিঅ্যাক্টরটি সর্বনিম্ন নিয়ন্ত্রণযোগ্য শক্তিস্তরে (Minimum Controllable Power Level—MCPL) পৌঁছায়।
২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক পরবর্তী পর্যায় শুরুর অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসানের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানায়, প্রথম ইউনিটের বি-১ পর্যায়ের কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হয়েছে এবং বি-২ পর্যায়ের প্রয়োজনীয় ভৌত পরীক্ষা ও অন্যান্য কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ধাপে যাওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এখন ইউনিটটি কমিশনিংয়ের ‘স্টেজ-সি’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের শক্তি ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর এবং নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। এরপর জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে জেনারেটরের সমন্বয় বা গ্রিড সিঙ্ক্রোনাইজেশন সম্পন্ন করতে হবে। এসব পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পরই পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে।
প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী নভেম্বরেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমোদন পাওয়া এর পূর্বশর্ত।
উল্লেখ্য, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরুর পর স্বয়ংক্রিয় চাপমুক্তকরণ নিরাপত্তা ভালভের (PORV/POSV) কারিগরি জটিলতার কারণে কমিশনিং প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছিল। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণের পর ভালভগুলোর পরীক্ষা সম্পন্ন করে। এরপরই নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পর্যায়ের কার্যক্রমের অনুমোদন দেয়।
দুটি ইউনিটে মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়ার প্রজন্ম-৩+ (জেনারেশন থ্রি প্লাস) প্রযুক্তির দুটি ভিভিইআর-১২০০ (VVER-1200) প্রেসারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রসাটমের প্রকৌশল বিভাগ প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন ও প্রধান ঠিকাদারের দায়িত্ব পালন করছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাষ্ট্রীয় ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মূল নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ চুক্তির আওতায় কেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম ইউনিটের কমিশনিংয়ের অগ্রগতি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ দেশের বিদ্যুৎ খাতে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহারিক যাত্রাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে নিরাপদ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ পরিচালনার প্রস্তুতিও এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।