October 26, 2026, 11:43 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার প্রত্যাশায় অভিভাবকেরা সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান। কিন্তু সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিশুদের যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৭২টি ঘটনায় অন্তত ১০৯ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় অপরাধের ভয়াবহতার পাশাপাশি সামনে এসেছে অভিযোগ প্রকাশে সামাজিক সংকোচ, প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা, শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার প্রশ্ন।
মাদ্রাসায় সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক, অভিযোগ জানানোর পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষ করে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা ও প্রচলিত ধারণার কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না বলে মনে করছেন অধিকারকর্মীরা। ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের বাইরেও নির্যাতনের ঘটনা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বনশ্রীর আবদুল্লাহর মৃত্যু, থমকে আছে বিচারপ্রক্রিয়া
শিশু নির্যাতনের অভিযোগের পর বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগের একটি উদাহরণ রাজধানীর বনশ্রীর একটি মাদ্রাসার ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর মৃত্যু। চলতি বছরের মে মাসে ওই মাদ্রাসা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে শিশুটির মা মামলা করেন। মামলার পর একই মাদ্রাসার এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হলেও ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাত মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
আবদুল্লাহর ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত, আলামত সংগ্রহ এবং বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে মামলার তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ কিংবা বিচারিক কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় এ ঘটনায় বিচার বিলম্বের নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি না হলে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ দীর্ঘায়িত হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
নয় মাসে ১৩১ ঘটনায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার ১৭১ শিশু
জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অন্তত ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ভুক্তভোগী ১৭১ জন। এর মধ্যে ১৬১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর সিংহভাগ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৭২টি ঘটনায় ১০৯ শিশুর যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি। এই দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক যৌন নির্যাতনের ঘটনা ও ভুক্তভোগীর হিসাব, অন্যটি দেশব্যাপী ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার হিসাব। ফলে এগুলোকে একই ধরনের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। পাশাপাশি পরিসংখ্যান দুটির মধ্যে কতটি ঘটনা অভিন্ন, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
তবে উভয় হিসাবই শিশুদের যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এসব পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে অপরাধের প্রকৃত ব্যাপ্তি বা সামগ্রিক প্রবণতা নির্ধারণ করতে হলে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, ঘটনার শ্রেণিবিন্যাস এবং উৎস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
বিচার নিশ্চিত করার পথে ফরেনসিক প্রমাণের জটিলতা
শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহ এবং তা আদালতে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ছেলে শিশুদের নির্যাতনের ঘটনায় শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাব বিচারপ্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান জানান, ছেলে শিশুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুতের বিষয়ে আলাদা সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বা নির্দেশনা নেই। এর ফলে মেডিকেল পরীক্ষা ও ডিএনএ বিশ্লেষণের মতো সংবেদনশীল প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও আদালতে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ফরেনসিক প্রমাণের গুরুত্ব থাকলেও যৌন নির্যাতনের অভিযোগের বিচার কেবল একটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে না। সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, তদন্তের মান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগ পাওয়ার পরপরই শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে চিকিৎসা ও পরীক্ষা নিশ্চিত করা, আলামতের যথাযথ সংরক্ষণ এবং তদন্তকারী সংস্থার দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও সমন্বিত কার্যপদ্ধতি থাকলে প্রমাণ সংগ্রহের ভুল কমানো এবং তদন্তের মান উন্নত করা সম্ভব হতে পারে।
লোকলজ্জা ও ভয়ে আড়ালে থেকে যায় অনেক ঘটনা
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ছেলে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে—এ বাস্তবতা অনেক পরিবার ও সমাজে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ফলে নির্যাতনের শিকার শিশুরা ভয়, লজ্জা, অপমানের আশঙ্কা কিংবা পরিবারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কারণে ঘটনার কথা প্রকাশ করতে দ্বিধা করতে পারে।
অভিভাবকেরাও সামাজিক সম্মানহানি, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধের আশঙ্কায় অভিযোগ জানাতে অনীহা দেখাতে পারেন। তবে এসব কারণ সব ঘটনার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা ও তথ্য প্রয়োজন। জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণে লোকলজ্জার কারণে বহু ঘটনা আড়ালে থেকে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
ঘটনা গোপন থাকলে নির্যাতনের শিকার শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া, তাকে দোষারোপ না করা এবং নিরাপদ পরিবেশে অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা ও জবাবদিহি
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে বয়সোপযোগী ধারণা দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা নির্যাতনের সম্ভাব্য লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন এবং শিশুর অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।
শিশু সুরক্ষায় শুধু সচেতনতামূলক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় পরামর্শসেবা এবং প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোনো শিশু অভিযোগ জানালে তাকে ভয় দেখানো, চুপ থাকতে বলা কিংবা সামাজিক সম্মানের অজুহাতে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা এবং শিশুদের জন্য সহজলভ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি। একটি শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর তার শারীরিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা রক্ষায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। এ দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ জন্য মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষার কার্যকর নীতিমালা, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের নির্দিষ্ট পদ্ধতি, শিক্ষক ও কর্মীদের আচরণবিধি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি জোরদার এবং অভিযোগের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পুরো প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়ী না করে প্রতিটি ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।
শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং বিচারব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দ্রুত চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়া, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া—প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।
জেএমবিএফের প্রকাশিত পরিসংখ্যান এবং বনশ্রীর আবদুল্লাহর ঘটনাকে ঘিরে বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নির্যাতন প্রতিরোধ, অভিযোগ প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।