February 7, 2026, 1:24 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটাই বিষয়—অর্থনীতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মন্দা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ আরও স্পষ্টভাবে জানতে চায়, তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য স্থাপন করেছে। অপরদিকে জামায়াত ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ও মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সংখ্যা যতই বড় হোক না কেন, প্রশ্ন একটাই—এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
প্রতিশ্রুতি বনাম নীতির ধারাবাহিকতা/
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায়, নির্বাচনি ইশতেহার নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিটি সরকারই উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে কাঠামোগত সংস্কার—বিশেষ করে কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে—ধারাবাহিক অগ্রগতি খুবই সীমিত।
এই বাস্তবতায় নতুন ইশতেহারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। অর্থনীতি কেবল উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণে এগোয় না; এগোয় নীতির স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক আস্থা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর। কোনো দেশই শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হতে পারে না; বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও নীতির ধারাবাহিক রূপরেখাই কার্যকর সমাধান।
কর্মসংস্থান: সংখ্যার চেয়ে গুণের গুরুত্ব/
দুই দলই কর্মসংস্থানকে নির্বাচনী ইশতেহারের কেন্দ্রে রেখেছে। এটি স্বাভাবিকও, কারণ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তির বাস্তবতায় কর্মসংস্থানই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান চাবিকাঠি।
তবে প্রশ্নগুলো অপরিহার্য—
কোন খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে?
দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কাঠামোগত পদক্ষেপ কী হবে?
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমবাজার কতটা মানিয়ে নিতে পারবে?
সংখ্যাগত বড় ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও অর্থনীতির দৃষ্টিতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান—যা আয় বাড়াবে, রপ্তানি সক্ষমতা উন্নত করবে এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
রাজস্ব ও কল্যাণ রাষ্ট্রের দ্বৈত চাপ/
দুই দলই সামাজিক নিরাপত্তা, নগদ সহায়তা, ভর্তুকি, বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে, করের চাপ না বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
এখানেই অর্থনীতির মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়—রাজস্ব না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ানো কতটা বাস্তবসম্মত? বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে হলে কর প্রশাসনের গভীর সংস্কার, কর জালের সম্প্রসারণ এবং অপচয় রোধ—এই তিনটি শর্ত অপরিহার্য।
বিনিয়োগ ও আস্থা: কাঠামোগত শর্ত
বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও রপ্তানি সম্প্রসারণ—সব দলই এগুলো বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বিনিয়োগ আসলে আস্থার ফল, প্রতিশ্রুতির নয়। রাজনীতির স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা—এই তিনটি শর্ত পূরণ না হলে শুধুমাত্র ইশতেহার দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়।
বিনিয়োগকারীরা চায়, নীতি হঠাৎ পরিবর্তন হবে না, অবকাঠামো স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত থাকবে এবং ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য হবে। আর বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই তিনটি শর্তই বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংকিং খাত: নীরব সংকট
অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা—এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি। উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য স্থাপন করার জন্য ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং তীক্ষ্ণ নীতিমূলক পদক্ষেপ অপরিহার্য।
লক্ষ্য নয়, বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা
ট্রিলিয়ন ডলার বা দ্বি-ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি—শোনার পর মনে হয় চমৎকার পরিকল্পনা। তবে বাস্তবতা আরও জটিল। প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে—
প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে?
বৈষম্য কমবে, নাকি বাড়বে?
কর্মসংস্থান টেকসই হবে কি?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা সক্ষম হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।
এই নির্বাচনে অর্থনীতি শুধু একটি ইস্যু নয়; এটি জাতীয় ভবিষ্যতের মূল বিষয়। দলগুলোর প্রতিশ্রুতি যতই বড় হোক না কেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতির ধারাবাহিকতা। কারণ ইতিহাস স্পষ্টভাবে বলে—অর্থনীতি প্রতিশ্রুতিতে বদলায় না, বদলায় সুশাসন ও বাস্তব নীতিতে।