February 13, 2026, 5:45 pm

ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস/
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস একটি টানা সরলরৈখিক যাত্রাপথ নয়; বরং এটি গঠিত হয়েছে ক্ষমতার পালাবদলের জটিল কিছু আন্তঃসম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–সামরিক হস্তক্ষেপ, গণআন্দোলনের জোয়ার, সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাস এবং জোটনির্ভর ক্ষমতার পালাবদল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে রাষ্ট্রগঠনের পরবর্তী অস্থিরতা, ১৯৭৫-পরবর্তী পটপরিবর্তন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তী নির্বাচনকেন্দ্রিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমাগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। এই বহুমাত্রিক ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যার জন্মই হয়েছিল এক অনিশ্চিত ও রূপান্তরমুখী সময়ের প্রেক্ষাপটে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনর্গঠন, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার পুনর্ব্যাখ্যা এবং বহুদলীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি—এই তিনটি উপাদান বিএনপির আত্মপ্রকাশকে ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। ফলে দলটির উত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা নয়; বরং বাংলাদেশের ক্ষমতার কাঠামো, শাসনদর্শন এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনাও নির্দেশ করে।
১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অভিঘাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো যখন পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যা একদিকে বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র পুনরায় উন্মুক্ত করে, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার নতুন রাজনৈতিক বয়ান সামনে আনে। পরবর্তী ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে দলটি দ্রুতই প্রান্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগ থেকে জাতীয় ক্ষমতার প্রধান ধারায় রূপান্তরিত হয় এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের ভিত্তি স্থাপন করে।
নেতৃত্বের পরিবর্তন ও গণআন্দোলনের অধ্যায়/
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক মুহূর্তে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে তার উঠে আসাটা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার এক অন্যরকম অধ্যায়। এ বছরই েদেশের রাজনীতিতে দুজন উত্তরাধিকারের আর্বিভাব ঘটে। একজন খালেদা জিয়া অন্যজন শেখ হাসিনা। যাহোক, খালেদার নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা এবং ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন—এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ বিএনপিকে কেবল নির্বাচনী দল হিসেবে নয়, বরং গণআন্দোলননির্ভর এক বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। একই সঙ্গে সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণকে প্রতীকী ও বাস্তব—উভয় অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পরবর্তী সময়ে, ১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচনের রাজনৈতিক সংকট, স্বল্পমেয়াদি সরকারের কার্যক্রম এবং বিরোধী দলে অবস্থানের অভিজ্ঞতা বিএনপির কৌশলগত ও সাংগঠনিক ক্ষমতাকে নতুনভাবে পরিমাপ করার সুযোগ প্রদান করে। এই সময়কাল দলের জন্য নীতি, সমঝোতা ও জোট রাজনীতিতে অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে কাজ করে। ২০০১ সালে জোটগত নির্বাচনী সাফল্যের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় ফেরা দলটির জন্য বড় অর্জন হলেও, পরবর্তী বছরগুলোতে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিকে তার সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা এবং জনসমর্থন শক্তিশালী করার জরুরি শিক্ষা প্রদান করে। এই অভিজ্ঞতাগুলো দলকে আগামী নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও সুসংগঠিত এবং কৌশলগতভাবে সাবধানী হওয়ার প্রেরণা যোগায়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্য ধারা: জামায়াতের পথচলা/
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এই দলটি স্বাধীনতার পর প্রথমে কার্যক্রমে বাধাপ্রাপ্ত থাকলেও পরে ধাপে ধাপে রাজনীতিতে পুনরায় সক্রিয় হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৮ আসন জয় অর্জন এবং ২০০১ সালের জোট সরকারের মধ্যে অংশগ্রহণ—এসব ঘটনা দলটির রাজনৈতিক প্রভাব ও উপস্থিতিকে আরও দৃঢ় এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী করে তোলে। একই সঙ্গে এই অভিজ্ঞতাগুলো জামায়াতকে জোটনির্ভর কৌশলগত ক্ষমতা ও নির্বাচনী সমঝোতার ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় এবং দক্ষ করে তুলে।
স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান-এর শাসনকালে শুরু হওয়া নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের পুনরুত্থান—এসব ঘটনা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর রাজনৈতিক ইতিহাসকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বিবর্তনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির পুনরায় সক্রিয় উপস্থিতি, বিশেষ করে জোটনির্ভর নির্বাচনী কৌশল এবং স্থানীয় স্তরে শক্তিশালী সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র এবং বহুমাত্রিক করেছে। এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্বাচনী মাঠে দুই প্রধান দল—বিএনপি ও জামায়াত—এর মধ্যে কৌশলগত এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে আরও দৃঢ় করেছে।
নতুন সময়, নতুন প্রত্যাশা/
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, তারেক রহমান, বিএনপির চেয়ারম্যান, এককভাবে সরকার গঠনের আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করছেন এবং দলের জয়লাভকে কার্যকর রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে বাস্তবায়নের প্রতি জোর দিচ্ছেন। অন্যদিকে, ডা. শফিকুর রহমান, জামায়াতের আমির, জনগণের মধ্যে নতুন ধারার রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন তুলে ধরছেন। এই দুই রাজনৈতিক অবস্থান দেশের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছে, যেখানে ঐতিহ্যগত দলীয় শক্তি ও জোটভিত্তিক কৌশল একসাথে নির্বাচনী সমীকরণকে নির্ধারণ করছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং শাসনের ধরন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দৃঢ় করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাটাই দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল কৌশল। বর্তমান নির্বাচন দেশকে নতুন রাজনৈতিক যুগের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আগামী দিনের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে মধ্য-ডান ধারার দলগুলো—বিশেষত বিএনপি ও জামায়াত—কীভাবে নীতি নির্ধারণ, প্রশাসন পরিচালনা এবং জনগণের বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হয় তার ওপর।