February 22, 2026, 12:37 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের ফলাফল সংখ্যাগত দিক থেকে যেমন হতাশাজনক, তেমনি তা বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচনী কাঠামো ও সামাজিক বাস্তবতার কিছু গভীর প্রবণতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে যেখানে অনেক দলে নারী প্রার্থীই ছিল না। এর মধ্যে ধর্মীয় দলগুলো রয়েছে। কারন এসব দল নারী নেতৃত্বে বিশ্বাসী নয়।
মোট ২,০২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন ৮৭ জন—অর্থাৎ প্রায় ৪ শতাংশের কিছু বেশি। দেশের অর্ধেক ভোটার নারী হলেও প্রার্থী হিসেবে তাঁদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। এর মধ্যেও প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পেরেছেন মাত্র ১৯ জন; বিজয়ী হয়েছেন ৭ জন।
নির্বাচন কমিশন ২৯৭টি আসনের ফল ঘোষণা করেছে। সেই হিসাবে সরাসরি নির্বাচিত নারীর হার দাঁড়ায় প্রায় ২.৩ শতাংশ। মনোনয়নপ্রাপ্ত নারীদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন ৮ শতাংশের কিছু বেশি; যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রার্থিতা ও জয়ের উভয় ক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে।
তবে লক্ষণীয় যে, বিজয়ী ৭ জনের কেউই এক লাখের কম ভোট পাননি। অর্থাৎ যেসব আসনে দলীয় সমর্থন, সাংগঠনিক শক্তি ও বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, সেখানে নারী প্রার্থীরা ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।
বিজয়ী সাতজনের ছয়জনই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রার্থী এবং একজন স্বতন্ত্র (যিনি পূর্বে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন)। এটি ইঙ্গিত করে যে, শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ও কার্যকর সাংগঠনিক সমর্থন ছাড়া নারী প্রার্থীদের পক্ষে জয় পাওয়া কঠিন।
উদাহরণস্বরূপ, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিজয়ী আফরোজা খানম সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন এবং পরে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। অন্যদিকে ফরিদপুর, নাটোর, সিলেট প্রভৃতি আসনেও বিএনপির মনোনীত নারী প্রার্থীরাই জিতেছেন। অর্থাৎ দলীয় সমর্থন, জোট-সমীকরণ ও স্থানীয় সংগঠন—এগুলো ছিল নির্ধারক।
অন্যদিকে স্বতন্ত্র ও ছোট দলের নারী প্রার্থীদের অনেকেই সম্মানজনক ভোট পেলেও জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটব্যবধান অতিক্রম করতে পারেননি। যেমন: ময়মনসিংহ-৬ আসনে আখতার সুলতানা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন; ঢাকা-১৯ আসনে এনসিপির দিলশানা পারুল লক্ষাধিক ভোট পেয়েও পরাজিত হয়েছেন; যশোর-২ আসনে সাবিরা সুলতানা বিপুল ভোট পেয়েও জিততে পারেননি।
এ থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও নির্বাচনী ব্যবস্থায় দলীয় প্রতীক ও জোট-সমীকরণ বড় ভূমিকা রাখে।
৮৭ নারী প্রার্থীর মোট প্রাপ্ত ভোটের ৯৭ শতাংশ পেয়েছেন মাত্র ১৯ জন। বাকি ৬৮ জনের অধিকাংশই ৩ হাজারের নিচে ভোট পেয়েছেন; ২৭ জন পেয়েছেন ৩০০-এরও কম।
এটি দুটি সম্ভাব্য বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়:
অনেক নারী প্রার্থী বাস্তবসম্মত প্রতিযোগিতার বাইরে ছিলেন;
কিছু দল হয়তো প্রতীকী উপস্থিতির জন্য নারী প্রার্থী মনোনীত করেছে, যেখানে মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রচারণা বা সংগঠন ছিল না।
ফলে নারী প্রার্থীদের সামগ্রিক ফলাফল দুর্বল দেখালেও প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আসনে চিত্র ভিন্ন।
তথ্য অনুযায়ী, নারী প্রার্থীদের ৭৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত এবং প্রায় ৬৭ শতাংশ কর্মজীবী। অর্থাৎ যোগ্যতা বা পেশাগত সক্ষমতার ঘাটতি ছিল—এমনটি বলা কঠিন।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠে: শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা কি সরাসরি নির্বাচনী সাফল্যে রূপান্তরিত হয়? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উত্তরটি জটিল। স্থানীয় প্রভাববলয়, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, দলীয় শক্তি ও সামাজিক নেটওয়ার্ক অনেক সময় ব্যক্তিগত যোগ্যতার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
কিছু নির্বাচিত ও পরাজিত নারী প্রার্থী নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ও সামাজিক পূর্বধারণার কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও এ দাবির পরিসংখ্যানগত প্রমাণ প্রতিবেদনে নেই, তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সামাজিক ও পারিবারিক বাধার মুখে পড়ে—এটি গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে।
তবে এটিও সত্য যে, যেখানে নারী প্রার্থী শক্তিশালী দলীয় কাঠামোর অংশ ছিলেন, সেখানে ভোটাররা লিঙ্গের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করেননি। অর্থাৎ লিঙ্গ একটি উপাদান হলেও একমাত্র নির্ধারক নয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট/
২৫ বছর পর এবার সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে—২০০১ সালের নির্বাচনে ৭ জন নারী জিতেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে নারীর সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হলেও সরাসরি নির্বাচনে নারীর সাফল্য স্থবির রয়েছে।
এটি ইঙ্গিত করে যে, সংরক্ষিত আসন কাঠামো নারীর সংসদীয় উপস্থিতি নিশ্চিত করলেও তৃণমূল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ তৈরিতে এখনো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের ফলাফল একদিকে প্রতিনিধিত্বের ঘাটতির চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে কিছু ইতিবাচক দিকও সামনে আনে:
শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম পেলে নারী প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে ও জয়ী হতে সক্ষম;
শিক্ষিত ও কর্মজীবী নারীদের রাজনীতিতে আগ্রহ বাড়ছে;
কয়েকটি আসনে নারী প্রার্থীরা খুব অল্প ব্যবধানে হেরেছেন, যা সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
অতএব, এটিকে কেবল “বিপর্যয়” হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন নীতি, নির্বাচনী অর্থনীতি, সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা যেতে পারে।
নারীর সংখ্যাগত উপস্থিতি বৃদ্ধি, প্রতিযোগিতামূলক আসনে মনোনয়ন, সংগঠনিক সহায়তা ও নারীবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ—এই চারটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে চিত্র ভিন্ন হতে পারে।