March 18, 2026, 10:32 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের ভূপ্রকৃতি, কৃষি ও জনজীবন বহু শতাব্দী ধরে নদী ও খালনির্ভর। একসময় গ্রামবাংলায় অসংখ্য খাল ছিল, যা বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করত, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের পানির জোগান দিত। একই সঙ্গে এগুলো ছিল নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, ভরাট ও অবহেলার কারণে দেশের হাজার হাজার খাল হারিয়ে যেতে থাকে। এর ফল হিসেবে জলাবদ্ধতা, কৃষি সংকট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়তে থাকে। এই বাস্তবতায় খাল খনন বা পুনঃখননের বিষয়টি বাংলাদেশের উন্নয়ন চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ধারার সূচনা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আর সাম্প্রতিক সময়ে তা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে তারেক রহমানের বক্তব্য ও পরিকল্পনায়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা। সেই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে খাল খনন ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক না থাকলে কৃষি ও গ্রামীণ জীবনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে খাল খনন, খাল সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমানের সময় গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর মধ্যে খাল খনন ছিল অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরে যাওয়ার পথ তৈরি হতো, আবার অনেক এলাকায় খালের মাধ্যমে কৃষিজমিতে সেচের সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়ে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি কিছুটা গতিশীল হয়। একই সঙ্গে এই ধরনের কর্মসূচি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সহায়ক হয়েছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অনেক জায়গায় হারিয়ে যায়। নগরায়ণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রভাবশালীদের দখলের কারণে অসংখ্য খাল বিলীন হয়ে যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে এবং মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে খাল পুনঃখননের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন বক্তব্যে জলাবদ্ধতা, কৃষি সংকট এবং পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় খাল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দেশের বহু অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনতে হলে খালগুলোকে আবার জীবন্ত করে তুলতে হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—খাল খনন করা হলেও শুষ্ক মৌসুমে এসব খালে পানি কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে? কারণ বর্ষাকালে পানি থাকলেও অনেক খালই শীত বা গ্রীষ্মে শুকিয়ে যায়। ফলে খালগুলো সেচ বা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় পুরোপুরি ভূমিকা রাখতে পারে না।
এই সমস্যার সমাধানের জন্য খাল ব্যবস্থাপনাকে নদী ও জলাধারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ভাবতে হবে। প্রথমত, বড় নদীর সঙ্গে খালের স্বাভাবিক সংযোগ বজায় রাখা জরুরি। নদীর সঙ্গে খালের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাই খালের মুখ বা সংযোগস্থল নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, যেখানে সম্ভব সেখানে ছোট ছোট জলাধার, বিল বা রিটেনশন পুকুর তৈরি করে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এই সংরক্ষিত পানি ধীরে ধীরে খালে সরবরাহ করা গেলে শুষ্ক মৌসুমেও কিছুটা পানি প্রবাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে। এটি কৃষি সেচের জন্যও কার্যকর হতে পারে।
তৃতীয়ত, অনেক এলাকায় সেচ পাম্পের মাধ্যমে নদী বা বড় জলাশয় থেকে খালে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে খাল শুধু বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। বরং এটি একটি সক্রিয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠবে।
চতুর্থত, খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে খালের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমে এবং স্থানীয় পরিবেশও উন্নত হয়।
তারেক রহমানের বক্তব্যে খাল খননকে একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অর্থাৎ শুধু খাল খনন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এর সঙ্গে নদী, বিল, জলাধার এবং সেচ ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে। তাহলেই এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় খাল পুনঃখননের ইতিবাচক ফলও দেখা গেছে। যেখানে খাল পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে জলাবদ্ধতা কমেছে, কৃষিজমি আবার চাষের উপযোগী হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মাছ চাষের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। যদি শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থা করা যায়, তবে এসব খাল গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য আরও বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে পানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিবৃষ্টি, বন্যা ও দীর্ঘ খরার মতো সমস্যার মোকাবিলায় প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। খাল পুনরুদ্ধার সেই বৃহত্তর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে খাল খননের বিষয়টি কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে চিন্তার সূচনা করেছিলেন, তা নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে আলোচনায় এনেছেন তারেক রহমান।
খাল যদি আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে—বর্ষায় পানি প্রবাহিত হয় এবং শুষ্ক মৌসুমেও পানির ব্যবস্থা থাকে—তবে তা কৃষি, পরিবেশ এবং গ্রামীণ জীবনের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথও তখন অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে।