June 16, 2026, 10:38 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন উপকূল সুরক্ষা বেড়িবাঁধ প্রকল্প ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধে নতুন মোড় এসেছে। সরকারি তদন্তে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য হাজী মো. নজরুল ইসলামের জমির মালিকানার দাবির সত্যতা না মিললেও, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের উত্থাপিত চাঁদা দাবির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে জমিকে নজরুল ইসলাম নিজের লিজকৃত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে প্রকল্পের কাজের বিরোধিতা করছিলেন, সেটি প্রকৃতপক্ষে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি। ফলে প্রকল্পে বাধা দেওয়ার পেছনে তার জমির মালিকানার দাবি ভিত্তিহীন বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
জানা গেছে, শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও কাশিমারী ইউনিয়নে প্রায় আড়াই কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আর-রাদ করপোরেশন অভিযোগ করে, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে প্রকল্পের কাজে বাধা দিয়ে আসছিলেন। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগও করেন।
বিরোধের প্রেক্ষাপটে পানি সম্পদ মন্ত্রীর নির্দেশে গত ১ জুন শ্যামনগর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা, প্রশাসনের প্রতিনিধি, বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রকল্পের সিসি ব্লক কাস্টিং ইয়ার্ড তার লিজ নেওয়া জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এ দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কমিটি গত ৪ জুন সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ৮ জুন প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের কাস্টিং ইয়ার্ড ওয়াপদা বাঁধসংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত এলাকায় নির্মিত হয়েছে। আর-রাদ করপোরেশন যে জমি ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে, তা বিআরএস দাগ নম্বর ৭০০১ ও ৭০০২-এর অন্তর্ভুক্ত, যার মালিকানা যথাক্রমে সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের।
অন্যদিকে, চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম যে দাগ নম্বরের জমি নিজের লিজকৃত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেছিলেন, তার অবস্থান প্রকল্প এলাকায় ব্যবহৃত জমি থেকে পৃথক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তার পক্ষ থেকে কোনো হালনাগাদ বৈধ লিজ দলিলও উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের অনুকূলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি লিজ দেওয়ার এখতিয়ার উপজেলা খাস জমি বন্দোবস্ত কমিটির নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট জমিতে চেয়ারম্যানের দাবি আইনগত ভিত্তি পায় না।
তদন্তের ফল প্রকাশের পর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আগের অভিযোগগুলোও নতুন করে সামনে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দাবি, জমির বিষয়টি ছিল প্রকৃত কারণ নয়; বরং চাঁদার দাবি পূরণ না হওয়ায় প্রকল্পের কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নজরুল ইসলাম একাধিকবার প্রকল্প এলাকায় গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। দাবি পূরণ না হলে প্রকল্প অফিসে হামলা, যন্ত্রপাতি ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর আক্রমণের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খানের দাবি, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে আরও চাপ সৃষ্টি করা হয়। চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিকদের কাজে বাধা দেওয়া এবং সাব-ঠিকাদারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ ঘটনায় গত ২৫ মে শ্যামনগর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় নজরুল ইসলাম, তার ছেলে আব্দুর রহমানসহ ২৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় চাঁদাবাজি, হামলা, প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ১৯ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে চেয়ারম্যান ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন এবং কাজ চালিয়ে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হত্যার হুমকি দেন। এছাড়া ২৩ মে প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর এবং তার অ্যাপল স্মার্টওয়াচ ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। মামলার বাদীর দাবি, এসব ঘটনার ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তার দাবি, তিনি সরকারি সামাজিক বনায়নের জমি রক্ষার স্বার্থে আপত্তি জানিয়েছেন এবং পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় প্রকল্পের কিছু কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে জমি-সংক্রান্ত দাবির সত্যতা না মেলায় প্রশ্ন উঠেছে, যে দাবিকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে আন্দোলন, মানববন্ধন, কাজ বন্ধ এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়েছিল, তার বাস্তব ভিত্তি কতটুকু ছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প শ্যামনগরের উপকূলীয় জনপদকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।