June 21, 2026, 10:34 am

ড. আমানুর আমানের কলাম
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সম্প্রতি বলেছেন যে “অনুকূল পরিবেশ হলে ভারত যাবেন প্রধানমন্ত্রী” এবং বাংলাদেশের বিদেশ সফরের সিদ্ধান্ত হবে সম্পূর্ণভাবে জাতীয় স্বার্থ ও দ্বিপাক্ষিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে। এই বক্তব্যটি কেবল একটি সম্ভাব্য সফরের ইঙ্গিত নয়; বরং বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।
বাংলাদেশ ও ভারত-এর সম্পর্ক ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার মতো বহু স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই “অনুকূল পরিবেশ” শব্দবন্ধটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে ভারতের ভূমিকা একটি অস্বীকার্য বাস্তবতা। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ-এ ভারতের সামরিক, রাজনৈতিক ও মানবিক সহায়তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ক কখনও উষ্ণ, কখনও শীতল পর্যায় অতিক্রম করেছে। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা সব সময় একই থেকেছে—বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতায় দুই দেশ পরস্পরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত দেড় দশকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক “স্বর্ণযুগ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন, ছিটমহল বিনিময়, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। একই সময়ে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারস্পরিক সন্দেহের মতো বিষয়গুলোও সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে “অনুকূল পরিবেশ” কথাটির একটি সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে—দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে উভয় পক্ষই আলোচনার মাধ্যমে বাস্তব ফলাফল অর্জনের সম্ভাবনা দেখতে পায়। কূটনৈতিক ভাষায় উচ্চ পর্যায়ের সফর সাধারণত তখনই হয়, যখন সফরের মাধ্যমে কোনো ইতিবাচক বার্তা, চুক্তি বা অগ্রগতি তুলে ধরা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারসাম্য রক্ষা। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার সময়ে বাংলাদেশ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে চীন-এর সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণ করছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়। এই অবস্থান অনেকটা বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতির আধুনিক রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
উপদেষ্টার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে এবং কোনো দেশ নির্ধারণ করবে না কখন বা কোথায় সফর করা হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অবস্থান। ছোট বা মাঝারি আকারের রাষ্ট্রগুলো প্রায়ই তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়। ফলে এই বক্তব্যকে কেবল ভারতের প্রতি নয়, বরং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতিও একটি বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ বন্ধ থাকা বা সীমিত থাকা উভয়ের জন্যই সুবিধাজনক নয়। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার, আর বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিবেশী। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো বিষয়গুলো দুই দেশকে একে অপরের কাছাকাছি থাকতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও ভারত সম্পর্কে দ্বৈত মনোভাব দেখা যায়। একদিকে ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক সহযোগিতার স্মৃতি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব রয়েছে; অন্যদিকে সীমান্ত হত্যা, নদীর পানি বণ্টন ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ফলে যে কোনো বাংলাদেশি সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের বিষয়। খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা যেমন সমালোচনার জন্ম দিতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত দূরত্বও জাতীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
“অনুকূল পরিবেশ” শব্দবন্ধটি তাই কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের ভাষা নয়; এটি সম্ভবত এমন একটি অবস্থার ইঙ্গিত, যেখানে পারস্পরিক আস্থা, আলোচনার প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য ফলাফলের বিষয়ে দুই দেশই ইতিবাচক অবস্থানে থাকবে। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তন যতই ঘটুক না কেন, শেষ পর্যন্ত বাস্তব স্বার্থই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
সার্বিকভাবে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যকে তিনটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, এটি বাংলাদেশের স্বাধীন ও স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির দাবি। দ্বিতীয়ত, এটি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ ও ফলাফলমুখী সম্পর্কের ইঙ্গিত। তৃতীয়ত, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস বিবেচনায় বলা যায়, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই “অনুকূল পরিবেশ হলে ভারত সফর” কথাটি মূলত দূরত্বের ঘোষণা নয়; বরং এমন এক কূটনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ, যেখানে বাংলাদেশ নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার আলোকে পরিচালনা করতে চায়। ইতিহাস, ভূগোল ও অর্থনীতির যুক্তি বলছে—দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত সহযোগিতা ও সংলাপের পথেই যেতে হবে।