July 15, 2026, 10:43 am

ড. আমানুর আমান
আইন আছে, বাস্তবায়ন কোথায়?
২০২৩ সালে সরকার কৃষিপণ্য বিপণন আইন কার্যকর করে চালের বাজারে দীর্ঘদিনের একটি অসঙ্গতি দূর করার উদ্যোগ নেয়। আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাজারে চাল বিক্রি করতে হলে ধানের প্রকৃত জাতের নাম ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ ‘বিআর-২৮’, ‘বিআর-২৯’, ‘স্বর্ণা’, ‘কাটারিভোগ’ বা যে জাত থেকেই চাল উৎপাদিত হোক, সেই পরিচয়ই প্যাকেট বা বাজারে উল্লেখ করতে হবে। কাল্পনিক বা বিভ্রান্তিকর নামে চাল বাজারজাত করার সুযোগ নেই।
এই আইন ছিল সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ এটি শুধু একটি নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি ভোক্তার জানার অধিকার প্রতিষ্ঠার আইন। একজন ক্রেতা কী কিনছেন, সেটি জানার অধিকার তাঁর মৌলিক ভোক্তা অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইন প্রণয়নের পর বাস্তবে কী পরিবর্তন এসেছে?
বাস্তবতা বলছে, খুব সামান্যই।
আজও দেশের অধিকাংশ বাজারে ‘মিনিকেট’ নামেই চাল বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা সেই নামেই চাল খুঁজছেন, ব্যবসায়ীরাও সেই নামেই বিক্রি করছেন। অর্থাৎ আইন বইয়ে থাকলেও বাজারে পুরোনো নিয়মই বহাল রয়েছে। আইন প্রয়োগে এই দুর্বলতা শুধু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিরও একটি প্রশ্ন।
যে আইন বাস্তবায়িত হয় না, তা ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারায়। তখন আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। কারণ তারা জানে, ধরা পড়ার ঝুঁকি কম, আর লাভের পরিমাণ অনেক বেশি।
এখানে সবচেয়ে বড় দায় মিলমালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের। তারা ভালো করেই জানেন, ‘মিনিকেট’ কোনো ধানের জাত নয়। তারপরও বাজারের চাহিদাকে পুঁজি করে বছরের পর বছর সেই নাম ব্যবহার করছেন। একটি কাল্পনিক পরিচয়কে বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডে পরিণত করে কোটি কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠেছে। এটি কেবল বিপণন কৌশল নয়; এটি ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা এবং সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থার পরিপন্থী।
অবশ্য দায় শুধু ব্যবসায়ীদের নয়। যেসব সংস্থা বাজার তদারকির দায়িত্বে রয়েছে—কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত—তাদের কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, উৎস পর্যায় থেকে মিল পর্যন্ত ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ।
অনেক দেশেই খাদ্যে ভেজাল বা বিভ্রান্তিকর লেবেলিংকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। কারণ খাদ্য নিয়ে প্রতারণা মানে শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ। বাংলাদেশেও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বারবার একই অপরাধে জড়িত মিল বা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত কিংবা বাতিল, উচ্চ অঙ্কের আর্থিক জরিমানা এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি ব্যবস্থার আওতায় আনার মতো কঠোর পদক্ষেপ বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর বাজার চলবে প্রতারণার নিয়মে।
তবে শুধু শাস্তিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনসচেতনতা। মানুষকে জানতে হবে, চকচকে সাদা চাল মানেই উন্নত চাল নয়। প্রকৃত ধানের জাত, পুষ্টিগুণ এবং নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। স্কুলের পাঠ্যক্রম থেকে শুরু করে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরকারি প্রচারণায় খাদ্যসচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
খাদ্য নিরাপত্তা কেবল পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং সঠিক পরিচয়ের খাদ্য নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে জাতি তার প্রধান খাদ্যের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পারে না, সে জাতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না।
মিনিকেট বিতর্ক তাই কেবল একটি চালের নামের বিতর্ক নয়। এটি ভোক্তার অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি, বাজারের নৈতিকতা এবং জাতীয় পুষ্টি নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে—আমরা কি প্রতারণার এই পুরোনো সংস্কৃতিকে বৈধতা দিয়ে যাব, নাকি আইন, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলব? কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু তার অর্থনীতির ওপর নয়, তার মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যের ওপরও নির্ভর করে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস