September 9, 2026, 6:25 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন /
দীর্ঘদিনের সেশনজট, পরীক্ষার সময়সূচি ও ফলাফল প্রকাশে বিলম্বসহ বিভাগের বিভিন্ন একাডেমিক ও অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের দাবিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) চারুকলা বিভাগে তালা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র-নজরুল কলা ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থিত বিভাগটিতে এ ঘটনা ঘটে।
পরে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা তালা খুলে দেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চারুকলা বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে সেশনজট রয়েছে। এর ফলে একই শিক্ষাবর্ষের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় তারা প্রায় এক থেকে দেড় বছর পিছিয়ে পড়েছেন।
২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা জানান, চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ফরম পূরণ প্রায় দেড় মাস আগে সম্পন্ন হলেও এখনো তাদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। একই শিক্ষাবর্ষের অন্যান্য বিভাগের অনেক শিক্ষার্থীর অনার্স ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে বলে তারা জানান।
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদেরও একই ধরনের একাডেমিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাদের দাবি, তৃতীয় পর্ব প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষ হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তারা পরবর্তী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ক্লাস করছেন বলে জানান তারা।
২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও সেশনজটের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অন্যান্য বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা যেখানে মাস্টার্সের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন, সেখানে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা মাত্র মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টারের ক্লাস শুরু করেছেন।
অবকাঠামোগত সংকটের অভিযোগ
একাডেমিক সমস্যার পাশাপাশি বিভাগের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন।
তাদের দাবি, বিভাগে গ্রাফিক্সের কাজের জন্য পর্যাপ্ত কম্পিউটার, প্রিন্ট করার জন্য নির্দিষ্ট কক্ষ, পর্যাপ্ত টেবিল, পানির ব্যবস্থা, ল্যাব ও ওয়ার্কশপ নেই। পাশাপাশি পেইন্টিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ইজেল, টুল, স্টুডিও ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও সীমিত।
স্থান সংকটের কারণে সাবেক উপাচার্যের উদ্যোগে ভবনের করিডোরে শিক্ষার্থীদের বসে কাজ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও জানান তারা। তবে সেখানে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় গরমের সময় কাজ করতে সমস্যায় পড়তে হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এ ছাড়া বিভাগের ওয়াশরুমের একটি ট্যাপ দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট থাকলেও বিষয়টি জানানোর পরও তা মেরামত করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
কোর্স ও শিক্ষক নিয়েও অভিযোগ
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের নিয়মিত ক্লাসের সময়সূচি শেষ হলেও কয়েকটি কোর্স এখনো সম্পন্ন হয়নি। শিক্ষক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় কোর্সগুলো অন্য বিভাগের শিক্ষকদের মাধ্যমে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও তারা অভিযোগ করেন।
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন সময় সভার কারণে শিক্ষকরা নির্ধারিত সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হন না। পাশাপাশি বিভাগীয় সভাপতিকে নিয়মিত বিভাগে পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকের পর তালা
এসব সমস্যা নিয়ে বুধবার সকালে বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে বৈঠকে বসেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে তারা সেশনজট, পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, আলোচনার সময় বিভাগীয় সভাপতি এসব সমস্যার সবগুলো সমাধান করতে পারবেন না বলে জানান এবং একপর্যায়ে বৈঠকস্থল ত্যাগ করেন। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরে তারা বিভাগে তালা দেন।
বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন বলেন, দীর্ঘ ১৮ থেকে ২০ মাস ধরে তারা বিভিন্ন সমস্যা বিভাগীয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছেন। কিন্তু সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তার অভিযোগ। বুধবারও তারা এসব বিষয়ে আলোচনা করেন। পরে আগামী সপ্তাহে এবং একাডেমিক কাউন্সিলের পর সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলে তারা তালা খুলে দেন।
যা বলছে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে চারুকলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান বলেন, চারুকলা বিভাগকে একটি বিশেষায়িত বিভাগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্সে এর পরীক্ষা ও মার্কিং পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। গত মাসে বিষয়টি সামনে এসেছে এবং বর্তমানে অর্ডিন্যান্স সংশোধনের কাজ চলছে। এ কারণে পরীক্ষাগুলো নিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান তিনি।
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ফল প্রকাশে বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন না করে বিদেশে অবস্থান করায় ফল প্রকাশে প্রায় পাঁচ মাস দেরি হয়েছে। ওই পরীক্ষক গত ৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বাকি কার্যক্রম প্রস্তুত রয়েছে এবং সম্পূর্ণ নম্বর পাওয়া গেলে দ্রুত ফল প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।
শিক্ষক সংকটের বিষয়েও তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও বিভাগীয় সভাপতির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—কবে নাগাদ পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হবে, আটকে থাকা ফলাফল প্রকাশিত হবে এবং বিভাগটির একাডেমিক ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে।
শিক্ষার্থীদের দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী আগামী সপ্তাহ এবং একাডেমিক কাউন্সিলের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।