February 5, 2026, 12:48 am

কুষ্টিয়া, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরায় মিঠাপানির ঘাটতির ফলে অধিকাংশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে লবণাক্ততা বেড়েছে, একই সময় কৃষিজমি অর্ধেকে নেমে এসেছে
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাই্মস/
শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি কমে যাওয়ার প্রভাব এখন আর কেবল নদীর তীরেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে, কৃষিজমি ও নদীপথে লবণাক্ততা বাড়ছে এবং মিঠাপানির মাছের স্বাভাবিক প্রজাতিগত ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। আবার বর্ষায় উজানের প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙনে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে গঙ্গানির্ভর অঞ্চলের জলপ্রবাহ ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে।
খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরায় মিঠাপানির ঘাটতির ফলে অধিকাংশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে লবণাক্ততা বেড়েছে। একই সময় কৃষিজমি অর্ধেকে নেমে এসেছে, গ্রামীণ বসতি কমেছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং মিঠাপানির জলাশয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে—যার আর্থিক ক্ষতি কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব সীমান্তের দুই পাশেই অনুভূত হচ্ছে: ভারতের উজান অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও পুনরাবৃত্ত বন্যা বাড়লেও কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
বিশ্ব অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উজানে নির্মিত অসংখ্য বাঁধ ও পানি প্রত্যাহার কাঠামো গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহকে ক্রমশ সংকুচিত করছে। যেহেতু গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান, তাই চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি ও পলি ব্যবস্থাপনায় ন্যায়ভিত্তিক ও সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা। অর্থনৈতিক ক্ষতি, প্রতিবেশব্যবস্থার বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন যেমন জরুরি, তেমনি নদীর প্রবাহসংক্রান্ত তথ্য জনসম্মুখে উন্মুক্ত করাও প্রয়োজন—যাতে নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে।
পানিসংকটকে কেবল কৃষি বা নৌপরিবহনের সমস্যা হিসেবে না দেখে জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের সমন্বিত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা দরকার। কারণ এটি মূলত একটি বৃহত্তর পরিবেশগত ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকটের অংশ।
সমাধানের পথ হিসেবে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় সংশ্লিষ্ট সব দেশের অংশগ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা—অর্থাৎ একটি আঞ্চলিক “কমপ্যাক্ট”—গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এতে পানি সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটন উন্নয়ন এবং শুষ্ক মৌসুমে ভাটির প্রবাহ বৃদ্ধির মতো বহুমাত্রিক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, পাশাপাশি ব্যয় ভাগাভাগির কাঠামোও নির্ধারিত হবে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে জলকূটনীতিকে স্থান দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর স্বীকৃতি, আঞ্চলিক সংলাপের প্রসার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে নদীগুলোকে দ্বন্দ্বের উৎস নয়, বরং সংযোগের সেতুতে রূপান্তর করলেই টেকসই ভবিষ্যতের পথ উন্মুক্ত হতে পারে।