February 17, 2026, 12:31 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেশের বাম ধারার রাজনীতির জন্য শুধু হতাশার নয়, বরং অস্তিত্বসংকটের এক কঠোর সতর্কবার্তা হয়ে সামনে এসেছে। বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ার উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ আসনে তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল নগণ্য—অনেক ক্ষেত্রে একশ’রও নিচে। নির্বাচনী বাস্তবতায় এই চিত্রকে বিশ্লেষকেরা দেখছেন দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক দুর্বলতা, কৌশলগত অদক্ষতা এবং জনসম্পৃক্ততার ঘাটতির সম্মিলিত পরিণতি হিসেবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও অন্যান্য বড় শক্তির মধ্যে, তখন বাম দলগুলো নিজেদের কার্যকর বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বহু আসনে জামানত রক্ষার ন্যূনতম ভোটও না পাওয়া তাদের বাস্তব গণভিত্তির সীমাবদ্ধতাকে নির্মমভাবে উন্মোচন করেছে।
জোটের আড়ালে শূন্যতা/
‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে বামপন্থি দলগুলো নির্বাচনে ঐক্যের বার্তা দিলেও ভোটের ফল সেই ঐক্যের সামাজিক ভিত্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদসহ একাধিক দল মিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক আসনে প্রার্থী দিলেও কোথাও উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। অধিকাংশ প্রার্থী গৃহীত ভোটের আট ভাগের এক ভাগও না পাওয়ায় জামানত হারান—যা কার্যত রাজনৈতিক ভরাডুবির পরিসংখ্যানগত প্রমাণ।
কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আসনে সীমিত ভোট পাওয়া ছাড়া সামগ্রিকভাবে তাদের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। বহু আসনে দুই অঙ্কের ভোটে সীমাবদ্ধ থাকা শুধু সাংগঠনিক দুর্বলতাই নয়; বরং মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ইঙ্গিত দেয়।
আদর্শের ভাষণ, সুবিধাবাদের অভিযোগ/
সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, সংকটের শিকড় আরও গভীরে। দীর্ঘদিন ধরে আদর্শিক রাজনীতির কথা বললেও বাস্তবে ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সুবিধা পাওয়া, কিংবা নির্বাচনী সমীকরণে নীরব সহায়তার অভিযোগ—এসব বিষয় বাম রাজনীতির নৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে নিজেদের ‘বিকল্প’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরার দাবি ভোটারদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে—এমন মূল্যায়ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, ক্ষমতার সমালোচনা আর ক্ষমতার ছায়ায় অবস্থান—এই দ্বৈত রাজনীতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে ক্ষয় করেছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিক আন্দোলনের অভাব, তরুণ সমাজের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বাস্তবসম্মত নীতিনির্ধারণী প্রস্তাবের ঘাটতি বাম রাজনীতিকে প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
নির্বাচনের পর যে কঠিন প্রশ্নগুলো রয়ে গেল
এই ফলাফল বাম রাজনীতির সামনে কয়েকটি অস্বস্তিকর কিন্তু অনিবার্য প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—
আদর্শিক অবস্থান কি বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারছে?
সংগঠন ও গণভিত্তি ছাড়া কেবল জোট কি কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে পারে?
অতীতের ক্ষমতাসংলগ্নতার দায় থেকে মুক্ত হয়ে নতুন আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব কি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গভীর আত্মসমালোচনা, নেতৃত্বের পুনর্গঠন এবং বাস্তবভিত্তিক জনসংযোগ ছাড়া পুনরুত্থানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। অন্যথায় বাম রাজনীতি ক্রমেই প্রতীকী উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে—যেখানে আদর্শ থাকবে, কিন্তু অনুসারী থাকবে না।
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি দেশের বাম ধারার রাজনীতির গভীর অন্তর্দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। আদর্শিক দৃঢ়তা, নৈতিক সামঞ্জস্য ও বাস্তব জনসম্পৃক্ততার প্রশ্নে এখন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নির্মম কিন্তু প্রয়োজনীয় পুনর্মূল্যায়নের সময়।