March 31, 2026, 6:23 pm

শুভব্রত আমান/
খুলনা বিভাগে হঠাৎ করে হাম রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীরব্যথা ও লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে। তবে চিকিৎসকদের মতে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, যদিও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলায় অন্তত ৭৯ জন শিশু বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই অন্তত ২৬ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কুষ্টিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালে মিলিয়ে ৬৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন, যাদের বড় অংশই হামের উপসর্গে আক্রান্ত। এছাড়া যশোরে ৬ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন এবং ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও মাগুরায় ২ জন করে শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। অন্যান্য জেলাতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তদের বেশিরভাগই অল্পবয়সী শিশু—বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী এবং ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যেসব শিশু এখনো পূর্ণ টিকাদান পায়নি বা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
হামের সাধারণ উপসর্গ হিসেবে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি তিন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা; তাদের বয়স ৫ থেকে ৮ মাসের মধ্যে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকায় মূলত উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসার ওপরই নির্ভর করতে হয়।
এদিকে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আইসোলেশন ইউনিট চালু থাকলেও শয্যা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা সীমিত। খুলনা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে এনআইসিইউ (NICU) সুবিধার সংকট গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মুজিবুর রহমান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলাতেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে সব জেলা হাসপাতালে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশ স্থানে তা কার্যকর করা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এনআইসিইউ সংকট। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অনেক স্থানে এখনও পর্যাপ্ত এনআইসিইউ সুবিধা নেই। অন্তত বড় জেলাগুলোতে এই সুবিধা চালুর চেষ্টা চলছে, যাতে জটিল রোগীদের দ্রুত সেবা দেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।