July 29, 2026, 12:25 pm

ড. আমানুর আমান
রকেটস অ্যান্ড ফেদারস’ শব্দটি বাংলাদেশের জনপরিসরে খুব পরিচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা বহু বছর ধরেই এই তত্ত্বের নির্মম উদাহরণ হয়ে আছে।
বাজারে গেলে মানুষ একটি প্রশ্নই করে—মূল্যস্ফীতি তো কমছে, তাহলে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ কিংবা সবজির দাম কমছে না কেন? অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ের ভাষা হয়তো এ প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না। কিন্তু অর্থনীতিতে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, যার নাম “Rockets and Feathers Effect”। অর্থাৎ, দাম বাড়ে রকেটের গতিতে, আর কমে পালকের মতো ধীরে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেড়ে যায়। পরিবহন ভাড়া বাড়ার অজুহাতে কৃষকের ক্ষেত থেকে বাজার পর্যন্ত প্রায় সব পণ্যের দাম লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু কয়েক মাস পরে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে, কিংবা সরকার দাম কমায়, তখন বাজারের পণ্যের দামে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায় না। প্রশ্ন করলে ব্যবসায়ীর উত্তর—”আগের দামে কেনা মাল এখনো বিক্রি শেষ হয়নি”, “শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে”, “অন্যান্য খরচ কমেনি”।
অর্থনীতির ভাষায় এটাই রকেটস অ্যান্ড ফেদারস ইফেক্ট।
এই ধারণাটি প্রথম আলোচনায় আসে জ্বালানির বাজার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পেট্রোলপাম্পে জ্বালানির দাম প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেড়ে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও খুচরা বাজারে সেই দাম কমতে অনেক বেশি সময় লাগে। পরে একই আচরণ খাদ্যপণ্য, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী, পরিবহনসহ বহু বাজারেই দেখা যায়।
এর পেছনে শুধু ব্যবসায়ীদের “লোভ” কাজ করে—এমন সরল ব্যাখ্যা দিলে ভুল হবে। আবার এটাও সত্য, শুধুমাত্র বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম দিয়ে এই বৈষম্য ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে অর্থনীতি, বাজার কাঠামো, তথ্যের অসমতা এবং ক্ষমতার সম্পর্ক—সব একসঙ্গে কাজ করে।
অর্থনীতিবিদ জর্জ অ্যাকারলফ তাঁর বিখ্যাত Information Asymmetry তত্ত্বে দেখিয়েছেন, বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার হাতে সমান তথ্য থাকে না। বিক্রেতা জানেন তার প্রকৃত ক্রয়মূল্য কত, মজুদ কত, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী। কিন্তু ভোক্তা এসব জানেন না। ফলে বিক্রেতা যখন বলেন, “নতুন চালান বেশি দামে এসেছে”, তখন ক্রেতার পক্ষে তা যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। এই তথ্যগত অসমতা দাম কমার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
আবার নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অলিভার উইলিয়ামসনের Transaction Cost Economics আমাদের শেখায়, দাম পরিবর্তন করাও একটি ব্যয়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। প্রতিদিন মূল্যতালিকা বদলানো, নতুন হিসাব করা, নতুন দর নির্ধারণ—এসবেরও প্রশাসনিক ব্যয় রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা দ্রুত দাম বাড়াতে আগ্রহী হলেও দাম কমানোর ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে চান।
তবে এটিই পুরো ব্যাখ্যা নয়।
আধুনিক শিল্পসংগঠন তত্ত্ব (Industrial Organization) বলছে, যেখানে প্রতিযোগিতা কম এবং বাজার কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে, সেখানে মূল্য কমানোর চাপও কম থাকে। বাংলাদেশে ভোজ্যতেল, চিনি, সিমেন্ট, ইস্পাত, এলপিজি, এমনকি অনেক খাদ্যপণ্যের বাজারে সীমিত সংখ্যক বড় ব্যবসায়ী বা আমদানিকারকের প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ বাজার পুরোপুরি প্রতিযোগিতামূলক নয়। ফলে কাঁচামালের দাম কমলেও ভোক্তার কাছে তার সুফল পৌঁছাতে দেরি হয়।
এখানেই আসে Market Power বা বাজার-ক্ষমতার প্রশ্ন।
অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের ভাষায়, বাজারে যখন বিক্রেতার দর-কষাকষির ক্ষমতা ক্রেতার তুলনায় বেশি হয়, তখন দাম শুধু চাহিদা-যোগানের নিয়মে নির্ধারিত হয় না; বরং ক্ষমতার ভারসাম্যও মূল্য নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের বহু নিত্যপণ্যের বাজারে এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু বিষয়টি আরও গভীর।
অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস বলেছিলেন, মানুষের প্রত্যাশাও অর্থনীতিকে চালিত করে। যদি ব্যবসায়ীরা মনে করেন ভবিষ্যতে আবার দাম বাড়বে, তাহলে বর্তমানেই তারা দাম কমাতে অনাগ্রহী থাকবেন। কারণ একবার কমালে পরে আবার বাড়ানো কঠিন হতে পারে। তাই তারা অপেক্ষা করেন। এই প্রত্যাশানির্ভর আচরণ মূল্যকে নিচের দিকে “আটকে” রাখে।
একে অর্থনীতিতে বলা হয় Downward Price Rigidity—অর্থাৎ দামের নিম্নমুখী অনমনীয়তা।
বাংলাদেশের মানুষ এই বাস্তবতা বহুবার দেখেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম কমেছে, কিন্তু আটার দাম কমেনি। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে, কিন্তু আমদানিকৃত পণ্যের দাম আগের জায়গায় রয়ে গেছে। কৃষকের মাঠে আলুর দাম অর্ধেকে নেমে গেলেও শহরের বাজারে সেই হারে কমেনি। পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য। কৃষক লোকসান করেন, ভোক্তা উচ্চমূল্য দেন, কিন্তু মধ্যবর্তী স্তরে দাম আটকে থাকে।
এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
এখানে আরেকটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ—Menu Cost Theory। নামটি শুনতে রেস্তোরাঁর মেনুকার্ডের মতো মনে হলেও, এর অর্থ হলো মূল্য পরিবর্তনের প্রশাসনিক ব্যয়। ব্যবসায়ী মনে করেন, বারবার দাম কমানোর চেয়ে কিছুদিন অপেক্ষা করাই সুবিধাজনক। এই মনোভাবও মূল্যহ্রাসকে ধীর করে।
আবার আচরণগত অর্থনীতি (Behavioral Economics) বলছে, মানুষ দাম বৃদ্ধিকে দ্রুত মেনে নেয়, কিন্তু দাম কমানোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখতে পারে না। কিছুদিন পর ভোক্তা নতুন দামকেই “স্বাভাবিক” হিসেবে গ্রহণ করে। অর্থনীতিতে এটিকে Price Adaptation বলা হয়। বিক্রেতারা এই মনস্তত্ত্বও কাজে লাগান।
বাংলাদেশে এই সমস্যা আরও জটিল হয় দুর্বল বাজার তদারকি, অপর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্বচ্ছতার কারণে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদক থেকে ভোক্তার মধ্যে পাঁচ-ছয়টি মধ্যবর্তী স্তর কাজ করে। প্রতিটি স্তর নিজস্ব মুনাফা যোগ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বা পাইকারি পর্যায়ে দাম কমলেও সেই সুবিধা পুরো শৃঙ্খল পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না।
ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারের মূল্য কমে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে।
Inflation কমা মানে দাম কমা নয়। এর অর্থ হলো দাম বাড়ার গতি কমেছে। যদি মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামে, তাহলে দাম এখনো বাড়ছে—শুধু আগের চেয়ে ধীরে বাড়ছে। দাম সত্যিকার অর্থে কমতে হলে Deflation প্রয়োজন, যা আধুনিক অর্থনীতিতে খুবই বিরল এবং অনেক সময় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণও।
তাই মূল্যস্ফীতি কমেছে শুনে মানুষ যখন বাজারে গিয়ে হতাশ হয়, তখন তাদের হতাশা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কারণ পরিসংখ্যানের ভাষা আর বাজারের বাস্তবতা এক জিনিস নয়।
তাহলে সমাধান কী?
শুধু মূল্য নির্ধারণ করে বা বাজারে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধান হবে না। প্রয়োজন কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা, বাজারে তথ্যপ্রবাহ উন্মুক্ত করা, প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করা, ডিজিটাল মূল্যপর্যবেক্ষণ চালু করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। একই সঙ্গে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের মূল্য সংযোজন প্রকাশ্য করা গেলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
অর্থনীতির একটি প্রাচীন শিক্ষা হলো—বাজার শুধু সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি মানুষের আচরণ, প্রত্যাশা, তথ্য, ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি সামাজিক ব্যবস্থা। তাই বাজারকে কেবল “চাহিদা-যোগান” দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।
বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজারে আজ সেই অদৃশ্য অংশটিরই নাম—রকেটস অ্যান্ড ফেদারস ইফেক্ট। এখানে মূল্যবৃদ্ধি রকেটের মতো আকাশ ছোঁয়, কিন্তু মূল্যহ্রাস পালকের মতো ধীরে ধীরে মাটিতে নামে। আর এই ধীরগতির ভার বহন করে সাধারণ মানুষ—যাদের আয় রকেটের গতিতে বাড়ে না, কিন্তু বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিদিনই লড়াই করতে হয়।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস