March 16, 2026, 9:21 am

ষষ্ঠ শ্রেণির পড়াশোনার মাঝেই পঞ্চম শ্রেণির প্রস্তুতি—উদ্বেগে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
আইনি জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে ২০২৫ সালের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বছরের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ এই সিদ্ধান্তে নতুন করে চাপে পড়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। বর্তমানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এসব শিক্ষার্থীকে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি আবার পঞ্চম শ্রেণির পুরোনো সিলেবাসে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
একদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে অল্প সময়ের ব্যবধানে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা—এর মাঝেই আবার বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়েছে এক ধরনের দ্বৈত চাপের মধ্যে। শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন-পুরোনো এই দুই ধরনের পাঠের চাপ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পরই পুরোনো বই ও গাইড বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে এখন নতুন করে সেসব বই সংগ্রহ করা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু নতুন শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবই ও শিখনপদ্ধতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। ফলে নতুন সিলেবাসের পাশাপাশি পুরোনো সিলেবাসে ফিরে গিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির পড়াশোনার মাঝেই পঞ্চম শ্রেণির প্রস্তুতি—উদ্বেগে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা
গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, গত বছরের স্থগিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিল মাসে ঈদুল আজহার আগেই অনুষ্ঠিত হবে। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই এই পরীক্ষা আয়োজন করা হবে।
এবার প্রথমবারের মতো কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। বৃত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ২০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাঁচটি বিষয়ে মোট ৪০০ নম্বরের এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ১০০ নম্বর করে এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৫০ নম্বর করে নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এটি কেবল সাধারণ পরীক্ষা নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক একটি বৃত্তি পরীক্ষা।
জানা গেছে, এবার মোট ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক বৃত্তি দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার মেধাবৃত্তি এবং ৪৯ হাজার ৫০০ সাধারণ বৃত্তি।
মেধাবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা এককালীন ২২৫ টাকা এবং মাসে ৩০০ টাকা করে পাবে। সাধারণ বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের এককালীন ২২৫ টাকা এবং মাসে ২২৫ টাকা দেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৭ সাল থেকে বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
অনেক শিক্ষার্থীই আগ্রহ হারাচ্ছে/
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, অনেক শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। খুলনার দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে মাধ্যমিকে চলে যাওয়া শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও অনেককে পরীক্ষায় রাজি করানো যায়নি।
গাজীপুরের একটি কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক জানান, তার প্রতিষ্ঠানে পঞ্চম শ্রেণিতে ৫০ জন শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আবেদন করাতে গিয়ে এক সপ্তাহ যোগাযোগের পর মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থীকে পাওয়া গেছে।
শহরের শিক্ষার্থীরা কোনোভাবে বই ও গাইড সংগ্রহ করতে পারলেও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছে।
রাজশাহীর মোহনপুরের হোটেল শ্রমিক আফজাল হোসেন বলেন, তার ছেলে ভালো ছাত্র হলেও এখন বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার ভাষায়, “ফাইভের গাইড বিক্রি করে সিক্সের গাইড কিনেছে। এখন আবার ফাইভের পরীক্ষা হলে ও কীভাবে দেবে?”
১৬ বছর পর বৃত্তি পরীক্ষা, তবু জটিলতা/
দীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রাথমিক স্তরে আবার বৃত্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। নীতিমালা প্রণয়ন, মানবণ্টন ও নমুনা প্রশ্নসহ সব প্রস্তুতি শেষ হলেও পরে আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
নীতিমালায় সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট অংশকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিধান থাকায় কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-অভিভাবকরা আদালতের দ্বারস্থ হন। পরে হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে নির্দেশ দেন।
এই আইনি জটিলতার কারণেই ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। এখন সেই পরীক্ষাই আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আবার নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে লাখো শিক্ষার্থী।