June 16, 2026, 6:12 pm

ড. আমানুর আমান
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের স্থান নয়; এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা ও উদ্বেগ প্রকাশের প্রধান মঞ্চ। বিশেষ করে বিরোধী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনজীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো সংসদে তুলে ধরা। কিন্তু যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনীতিতে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট, বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতি,মাদ্রাসাগুলাতে ধর্ষণ কিংবা জনদুর্ভোগের মতো বিষয়গুলো সমাজে ব্যাপক আলোচিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সংসদে বিরোধী দল এসব বিষয়ে যথেষ্ট সরব নয় কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। অনেক সময় দেখা যায়, বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত থাকলেও জনজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলোর পরিবর্তে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করে। এতে জনগণের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয় যে রাজনৈতিক দলগুলো বাস্তব সমস্যার চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো দ্রব্যমূল্য। খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়—সবকিছুই অনেক পরিবারের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। সংসদে বিরোধী দলের কাছ থেকে জনগণ আশা করে যে তারা তথ্য-উপাত্তসহ এই সমস্যাগুলো তুলে ধরবে, সরকারের নীতির সমালোচনা করবে এবং বিকল্প প্রস্তাব দেবে। যদি তারা তা না করে, তাহলে জনগণের একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই হতাশ বোধ করতে পারে।
তবে বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। অনেক সময় বিরোধী দল মনে করে যে সংসদে তাদের বক্তব্য যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না বা কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে না। ফলে তারা সংসদের বাইরে আন্দোলন, সংবাদ সম্মেলন বা জনসভাকে বেশি কার্যকর রাজনৈতিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এটি রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংসদকে উপেক্ষা করলে কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়, নাকি দুর্বল হয়? অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সংসদের ভেতরে এবং বাইরে—দুই জায়গাতেই সক্রিয় থাকা একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের বৈশিষ্ট্য।
অর্থনীতির প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও আলোচিত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে তার প্রভাব কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ওপর পড়তে পারে। এসব বিষয়ে সংসদে গভীর ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া উচিত। বিরোধী দল যদি এসব প্রশ্ন যথেষ্ট জোরালোভাবে না তোলে, তাহলে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি সতর্কতাও প্রয়োজন। কোনো বিরোধী দল সংসদে একটি বিষয় কম তুলেছে বলেই ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের সমস্যা এড়িয়ে যাচ্ছে। কখনও এটি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন হতে পারে, কখনও সাংগঠনিক দুর্বলতা, আবার কখনও কার্যকর গবেষণা ও নীতিগত প্রস্তুতির অভাবও কারণ হতে পারে। তাই “তারা ইচ্ছে করে করছে” কিংবা “না জেনে করছে”—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তবতাকে অতিসরলীকরণ হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গণতন্ত্রে শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে সমালোচনাকে উৎসাহিত করা এবং সংসদকে কার্যকর বিতর্কের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা। সংসদ যদি প্রাণবন্ত না হয়, যদি তথ্যভিত্তিক বিতর্কের সংস্কৃতি দুর্বল হয়, তাহলে বিরোধী দলের কার্যকারিতাও সীমিত হয়ে যেতে পারে। একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব আছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণানির্ভর বিকল্প নীতি ও সমাধান উপস্থাপন করা।
জনগণ আসলে বিরোধী দলের কাছ থেকে শুধু সমালোচনা চায় না; তারা চায় সমাধানের পথও। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কী করা যেতে পারে, বিনিয়োগ বাড়াতে কী ধরনের নীতি প্রয়োজন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কী উদ্যোগ নেওয়া উচিত—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাব থাকলে বিরোধী দলের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। একইভাবে সরকারও তখন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়।
সবশেষে বলা যায়, সংসদে বিরোধী দলের নীরবতা বা সীমিত সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। তবে সেই প্রশ্ন যেন তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে হয়। বিরোধী দল যদি জনগণের প্রকৃত সমস্যাগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়, তাহলে তা অবশ্যই সমালোচনার দাবি রাখে। আবার তাদের অবস্থান ও সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সরকার যেমন, তেমনি প্রয়োজন দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর ও সক্রিয় বিরোধী দল। জনগণের স্বার্থেই সংসদে আরও বেশি বাস্তবমুখী আলোচনা, জবাবদিহিতা এবং নীতিগত বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে ওঠা জরুরি।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর/ দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস