September 10, 2026, 2:47 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
রাত তখন সাড়ে ৮টা। দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ির পথে ফিরছিলেন মোলায়েম হোসেন (৪৮)। পথে গ্রামের একটি স্কুলের সামনে পৌঁছাতেই কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাদের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোলায়েমকে ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে তারা। গুরুতর জখম অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকেন তিনি। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভায়না ইউনিয়নের কালীশংকরপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত মোলায়েম হোসেন ভায়না ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য এবং ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেছে।
হরিণাকুণ্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খাঁন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোলায়েম হোসেন বুধবার রাতে পাশের আব্দালপুর গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে দুই বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে হরিশংকরপুর গ্রামের একটি স্কুলের সামনে পৌঁছালে আগে থেকে সেখানে অবস্থান নেওয়া একদল দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলটির পথ আটকে দেয়।
মোটরসাইকেল থামার সঙ্গে সঙ্গেই মোলায়েমকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। তার সঙ্গে থাকা দুই ব্যক্তি কীভাবে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে যান, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।
আহত অবস্থায় মোলায়েমকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের স্ত্রী শিল্পী খাতুন বলেন, বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে তার স্বামীকে গ্রামের স্কুলের পেছনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি কোপের চিহ্ন রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
শিল্পী খাতুন আরও জানান, তার স্বামী আগে থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্বশত্রুতার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। ওসি মাসুম খাঁন বলেন, মোলায়েম হোসেনকে গুরুতরভাবে কুপিয়ে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
তবে কার সঙ্গে কী ধরনের বিরোধ ছিল এবং সেই বিরোধের সূত্র ধরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হত্যার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত শত্রুতা নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে—তা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে মোলায়েম হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি ভায়না ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে তাকে একটি চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও স্থানীয় পর্যায়ে দাবি রয়েছে। তবে এ পরিচয়ের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও দেখা দেয়।
এদিকে নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হরিণাকুণ্ডু থানার পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি হত্যার সম্ভাব্য কারণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মোলায়েম হোসেনের ওপর হামলার ধরন—মোটরসাইকেলের গতিরোধ, আগে থেকে ওত পেতে থাকা হামলাকারীদের উপস্থিতি এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক কোপ—এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হামলার দিকেও ইঙ্গিত করতে পারে। তবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কি না, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
একজন জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে এভাবে প্রকাশ্যে হামলা করে হত্যার ঘটনায় এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখন পুলিশের তদন্তে হত্যার প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং এ ঘটনার নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক বা স্থানীয় বিরোধ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।