April 14, 2026, 11:31 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়—চেয়ার কেবল বসার জায়গা নয়, এটি সময়ের মতোই অস্থায়ী। আর ক্ষমতার করিডোরে কখন যে ‘আপনি আছেন’ থেকে ‘আপনি ছিলেন’ হয়ে যেতে হয়—তা বোঝা যায় অনেক সময় ঠিক তখনই, যখন আপনি মঞ্চের সামনের সারিতেই বসে থাকেন।
মঞ্চে সব ঠিকঠাকই ছিল। সামনে ব্যানার, পেছনে স্বপ্ন, মাঝখানে শিক্ষামন্ত্রী—আর তার একেবারে পাশেই বসে উপাচার্য। যেন সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে। কিন্তু জীবন নামের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কখন যে ‘সারপ্রাইজ টেস্ট’ এসে যায়, তার সিলেবাস কেউ আগে থেকে পায় না!
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) সেদিনও তেমনই এক অঘোষিত পরীক্ষা। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন। তাকে স্বাগত জানাতে, পাশে বসে নিজের কর্মপরিকল্পনার কথা শোনাতে—সব প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মজিদ।
সকাল থেকে মন্ত্রীসঙ্গী হয়ে ঘোরাফেরা, হাসিমুখে আলাপ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বর্ণনা—সবই চলছিল ঠিকঠাক। বলা যায়, দিনটা ছিল ‘চেয়ার-সুখের’ দিন। কিন্তু বিকেলের মধ্যেই সেই চেয়ার যেন গল্পের প্লট টুইস্ট হয়ে গেল।
প্রশাসনিক ভবন থেকে একাডেমিক ভবনে পৌঁছানোর মাঝেই খবর এলো—উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাকে। যে মানুষটি একটু আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছিলেন, তিনি হঠাৎই নিজের বর্তমান হারানোর সংবাদ পেলেন। যেন নিজেরই আয়োজন করা মঞ্চে নিজের বিদায়ের ঘোষণাটি শুনতে হলো!
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে তাকে অব্যাহতি দিয়ে মূল কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। জনস্বার্থে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক কার্যকর। অর্থাৎ, ‘এখনই নামতে হবে’—এমন এক বাস, যার টিকিট কেউ কাটেনি, কিন্তু নামতে হলো ঠিকই।
তার জায়গায় নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর। বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী আগামী চার বছরের জন্য তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—যদিও এ ক্ষেত্রেও ছোট্ট একটি ফুটনোট আছে: প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় এই নিয়োগ বাতিল করা যাবে। অর্থাৎ, এই চেয়ারেরও নিজস্ব অনিশ্চয়তা আছে—এক ধরনের ‘চলমান শর্তাবলী প্রযোজ্য’।
২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চার বছরের জন্য দায়িত্ব পাওয়া ড. আব্দুল মজিদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এমন বিদায়—অনেকটা অর্ধেক লেখা গল্পের মতো। শেষটা তিনি নিজেও হয়তো জানতেন না।
অব্যাহতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি। হয়তো কিছু গল্প কথায় বলা যায় না—সেগুলো শুধু চোখের কোণে জমে থাকে, কিংবা হালকা এক চাপা হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে।
ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, যে অনুষ্ঠানটি এত আয়োজন করে করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল এক অপ্রত্যাশিত বিদায়ের মঞ্চ। যেন হাসির আড়ালে লুকানো একটুখানি বিষাদ—যেখানে করতালির শব্দের ভেতরেও শোনা যায় নীরবতার প্রতিধ্বনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়—চেয়ার কেবল বসার জায়গা নয়, এটি সময়ের মতোই অস্থায়ী। আর ক্ষমতার করিডোরে কখন যে ‘আপনি আছেন’ থেকে ‘আপনি ছিলেন’ হয়ে যেতে হয়—তা বোঝা যায় অনেক সময় ঠিক তখনই, যখন আপনি মঞ্চের সামনের সারিতেই বসে থাকেন।