May 25, 2026, 2:03 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার-এ সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য জারি করা বিতর্কিত ‘ড্রেস কোড’ অবশেষে বাতিল হওয়ায় বিভিন্ন মহলে স্বস্তি প্রকাশ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, সাংবাদিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত এই অযৌক্তিক নির্দেশনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার নয়; বরং ব্যক্তিস্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা এবং নাগরিক সংবেদনশীলতার প্রতি জনগণের শক্ত অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
গত ৪ মে বাংলাদেশ বেতারের কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থার পক্ষ থেকে সংবাদ উপস্থাপকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পোশাকবিধি জারি করা হয়। সেখানে নারী উপস্থাপকদের শাড়ি অথবা ওড়নাসহ সালোয়ার-কামিজ পরার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকি বড় টিপ ব্যবহার না করা কিংবা একপাশে ওড়না না পরার মতো বিষয়ও নির্দেশনায় উল্লেখ ছিল। অন্যদিকে পুরুষ উপস্থাপকদের জন্য ফুলহাতা শার্ট ও টাই বাধ্যতামূলক করা হয়।
এই নির্দেশনা প্রকাশ্যে আসার পরই দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিশেষ করে নারী উপস্থাপকদের পোশাক, অলংকার ও ব্যক্তিগত উপস্থাপনা নিয়ে আলাদা করে নির্দেশনা দেওয়াকে অনেকে সরাসরি লিঙ্গবৈষম্যমূলক ও রক্ষণশীল মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেন। প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কাজ কি সংবাদ পরিবেশন, নাকি কর্মীদের ব্যক্তিগত পোশাক ও সাজসজ্জা নিয়ন্ত্রণ করা?
সমালোচকদের মতে, একজন সংবাদ উপস্থাপকের মূল পরিচয় তার ভাষা, বাচনভঙ্গি, বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও পেশাদারিত্বে। পোশাকের ধরন দিয়ে সংবাদ উপস্থাপনার মান নির্ধারিত হয় না। বরং এ ধরনের নির্দেশনা কর্মক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ ধরনের ড্রেস কোড ভবিষ্যতে আরও কঠোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের পথ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচিত দক্ষতা ও পেশাদার আচরণের ওপর জোর দেওয়া, ব্যক্তিগত রুচি বা পোশাককে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নয়। কারণ পোশাকের প্রশ্নে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ প্রায়ই সমাজে সংকীর্ণতা ও বৈষম্যের সংস্কৃতি তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাধারণ মানুষ ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানান। অনেকেই লেখেন, দেশে যখন দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও জনদুর্ভোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে, তখন সংবাদ উপস্থাপকের টিপের আকার বা ওড়নার ধরন নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নয়।
অবশেষে রোববার বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এএসএম জাহীদের স্বাক্ষরিত নতুন আদেশে আগের নির্দেশনা বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, জনগণের সমালোচনা ও গণতান্ত্রিক চাপের মুখে ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা পরিণত ও দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয়।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো—সমাজে এখনও স্বাধীন চিন্তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষায় জনগণের সচেতন অবস্থান রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত সেই বাস্তবতাকে সম্মান করা।