May 17, 2026, 12:58 pm

ড. আমানুর আমানের কলাম/
২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা আগামী ৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শিক্ষা খাতে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষা ক্যালেন্ডার বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বছরের বাকি সময়, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত, বাস্তবে মাত্র ১১৫ দিন শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণের সুযোগ পাবে। এই সীমিত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত বাস্তবতার সঙ্গে ক্যালেন্ডারভিত্তিক পরিকল্পনার একটি অসামঞ্জস্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে সরকার সময়মতো পরীক্ষা আয়োজনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাচ্ছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় পাঠদানের সময় সংকুচিত হয়ে পড়ছে ছুটি, পরীক্ষা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের কারণে। ফলে শিক্ষার্থীরা যে পরিমাণ শেখার সময় পাচ্ছে এবং যে পরিমাণ সিলেবাস শেষ করতে হচ্ছে—তার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া বা গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা, যাদের শিক্ষার পরিবেশ ও সহায়ক ব্যবস্থা সীমিত, তারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্বল্প সময়ে সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে মুখস্থনির্ভরতা ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে পরীক্ষাকেন্দ্রিক, যা দীর্ঘমেয়াদে শেখার গুণগত মানকে প্রভাবিত করবে।
শিক্ষাবিদদের দৃষ্টিতে সমস্যাটি আরও গভীর। তাঁদের মতে, শুধু সময় কমে যাওয়াই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পূর্ববর্তী বছরের শিখন ঘাটতি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাঠ্যবই বিতরণে বিলম্ব, দীর্ঘ ছুটি এবং অনিয়মিত ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতির মধ্য দিয়ে গেছে। এই অবস্থায় হঠাৎ করে ১১৫ দিনের মধ্যে পূর্ণ সিলেবাস শেষ করার চাপ বাস্তবসম্মত নয়।
তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের একটি যুক্তিও রয়েছে। শিক্ষাবর্ষকে নির্দিষ্ট কাঠামোয় আনার মাধ্যমে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং পরীক্ষার সময় নির্ধারণে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। অতীতের অনিশ্চিত পরীক্ষার সময়সূচি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে বলে মনে করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুসরণকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সমস্যা সমাধানে শিক্ষাবিদরা একাধিক প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রেমিডিয়াল ক্লাস চালু করা, সাপ্তাহিক বা দৈনিক কন্টাক্ট আওয়ার বাড়ানো, প্রি-টেস্ট ও টেস্ট পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাস এবং দুর্যোগকালীন বিকল্প শিক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ। কেউ কেউ পাবলিক পরীক্ষার কাঠামোগত সংস্কারের কথাও বলেছেন, যেখানে সব বিষয়ের পরিবর্তে মূল বিষয়গুলোর ওপর কেন্দ্রীয় পরীক্ষা এবং বাকি বিষয়গুলো স্কুলভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিষয়টি শুধুমাত্র সময়ের হিসাব নয়, বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং সক্ষমতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। একদিকে নীতিগত শৃঙ্খলা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না হলে শিক্ষার্থীরা চাপের মুখে পড়বে, যা ভবিষ্যতের শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
অতএব, এই সিদ্ধান্তের সফলতা নির্ভর করবে শুধু ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের ওপর নয়, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কার্যকর মনিটরিং এবং বাস্তবভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষার মূল লক্ষ্য যদি সত্যিই শেখা হয়, তবে সময় নয়—গুণগত শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের প্রধান অগ্রাধিকার।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস/