May 19, 2026, 3:28 pm

ড. আমানুর আমানের কলাম
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ এ অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জেলার অন্যতম কলেজ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এটি শুধু শিক্ষার্থীকে একাডেমিক জ্ঞান প্রদান করেনি; একই সঙ্গে চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ; বরং কুষ্টিয়া অঞ্চলের শিক্ষা-সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, মানবিক চর্চা এবং সামাজিক মূল্যবোধ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
কুষ্টিয়া ও পার্শ্ববর্তী জেলার অসংখ্য শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। ফলে কলেজটি কেবল পাঠদান বা পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি অঞ্চলের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও সামাজিক চেতনার ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই কলেজের শিক্ষা পরিবেশ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মুক্তচিন্তা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকাশে প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহাসিক ভূমিকা স্থানীয় সমাজে আলাদাভাবে স্বীকৃত। ফলে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা ও আস্থার গভীরতা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশি। কারণ একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনোই শুধু অবকাঠামো বা একাডেমিক কার্যক্রমের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয় না; বরং তার নৈতিক অবস্থান, প্রশাসনিক সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চার পরিবেশ এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির সক্ষমতার মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে কলেজটিকে ঘিরে যে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য, কলেজ প্রশাসনের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক, ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও গাছ কাটার মতো ঘটনাগুলো কলেজের ভাবমূর্তিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। জামাতে ইসলামীর একজন প্রযাত নেতাকে কোট করে সাংবাদিকদের নিয়ে অসর্তক মন্তব্য এসব ঘটনায় অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মানুষ মনে করেছিলেন—একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও সমন্বিত প্রশাসনিক ভূমিকা প্রয়োজন ছিল।
এরই মধ্যে কলেজের অধ্যক্ষ পদে পরিবর্তন এসেছে। বিদায়ী অধ্যক্ষ মোল্লা রুহুল আমিনের দায়িত্বকালকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার অবসানের মধ্য দিয়ে এখন নতুন নেতৃত্বের অধীনে কলেজটির জন্য নতুন যাত্রা শুরু হলো। নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন ড. মোহা. আব্দুল লতিফ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এই কলেজের শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
ড. আব্দুল লতিফ একজন অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষাবিদ হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি শিক্ষার্থীবান্ধব, সংযত ও দায়িত্বশীল শিক্ষক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। পাশাপাশি একই কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কলেজের একাডেমিক পরিবেশ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় তৈরিতে তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারও আগে তিনি জেলারই খোকসা উপজেলার খোকসা সারকী কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এখন কলেজ পরিবার, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং সচেতন মহলের প্রত্যাশা—নতুন প্রশাসনের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ আবারও তার ঐতিহ্যগত মর্যাদা, একাডেমিক উৎকর্ষ এবং জনআস্থার অবস্থানে ফিরে যাবে। কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি কেবল তার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ফলাফল বা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নৈতিক দায়বদ্ধতা, মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের ওপর।
একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজের মর্যাদা নির্ধারিত হয় মূলত তার জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি, প্রশাসনিক সততা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক সম্পর্কের মাধ্যমে। যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সত্যকে গ্রহণ করার সাহস, সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তখনই সেই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু একাডেমিক মান উন্নয়ন নয়; বরং এমন একটি শিক্ষাবান্ধব ও নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে শিক্ষার্থী নিজেকে নিরাপদ, সম্মানিত ও অনুপ্রাণিত বোধ করবে। ফলে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের নতুন প্রশাসনের সামনে দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা নয়; একই সঙ্গে একটি আস্থাশীল, জবাবদিহিমূলক এবং ইতিবাচক শিক্ষাঙ্গন পুনর্গঠনেরও।
শুরুতেই নতুন অধ্যক্ষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে একজন দক্ষ, যোগ্য ও সহযোগিতাপূর্ণ উপাধ্যক্ষকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক টিম গঠন করা। কারণ একটি বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর পরিচালনা কখনোই একক নেতৃত্বের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং সমন্বিত, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী প্রশাসনিক কাঠামোর ওপরই একটি প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা ও সাফল্য নির্ভর করে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের নানা বিতর্ক ও প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কলেজটিতে পারস্পরিক আস্থা, সমন্বয় এবং কার্যকর যোগাযোগ পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে উপাধ্যক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিজ্ঞ ও ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন উপাধ্যক্ষ একদিকে যেমন একাডেমিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে পারেন, অন্যদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ব্যক্তি নির্ভরতার পরিবর্তে দলগত নেতৃত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তাই নতুন অধ্যক্ষের যাত্রার শুরুতেই একটি দক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও সহযোগিতামূলক প্রশাসনিক টিম গঠন করা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের অন্যতম পূর্বশর্ত হতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা সামনে এসেছে, তা হলো—একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভ্রান্তি, অস্বচ্ছতা কিংবা সমালোচনাকে আড়াল করার প্রবণতা কখনো দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। বরং সত্যকে গ্রহণ করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সংশোধনের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পুনর্গঠনের পথ তৈরি করে।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই প্রত্যাশা আরও বেশি। কারণ এই কলেজ শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি অঞ্চলের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করে না; বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধও শিখে।
নতুন অধ্যক্ষের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কলেজে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। সমালোচনাকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং উন্নয়নের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি হবে। শিক্ষার পরিবেশ, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাবে।
বিশেষ করে ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও গাছ কাটার মতো বিতর্কের পর এখন অনেকেই প্রত্যাশা করছেন—নতুন প্রশাসন সবুজ ও পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস গঠনে উদ্যোগী হবে। কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য শুধু তার ভবনে নয়; বরং তার পরিবেশ, সংস্কৃতি ও মানসিকতায়ও প্রতিফলিত হয়। গাছ কাটা নয়, বরং গাছ লাগানো এবং পরিবেশ রক্ষা করাই একটি আধুনিক ও সচেতন শিক্ষাঙ্গনের পরিচয় হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস, দায়িত্বশীলতা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সংস্কৃতি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কখনোই সমালোচনাকে দমন করে নয়, বরং সত্যকে গ্রহণ করে এবং সংশোধনের পথ তৈরি করেই রক্ষা করা সম্ভব। একটি দায়িত্বশীল প্রশাসন ভুল হলে সেটি স্বীকার করবে, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেবে এবং ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের নতুন অধ্যক্ষের যাত্রা তাই শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি কলেজটির জন্য নতুন আস্থা, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন সম্ভাবনার সূচনা। এখন দেখার বিষয়, নতুন নেতৃত্ব কতটা দক্ষতার সঙ্গে কলেজের একাডেমিক পরিবেশ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে। কারণ এই কলেজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অঞ্চলের মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।