June 10, 2026, 8:10 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
ইউনূস সরকারের সময়কার অধ্যায় পেরিয়ে নতুন সম্পর্কের দিকে ঢাকা-দিল্লি : তথ্য উপদেষ্টা নিয়ন্ত্রণহীন রেস্তোরাঁ বাজার/ দাম বাড়ছে একই, কিন্তু প্রতিদিন ছোট হচ্ছে গ্রাহকের প্লেট কুষ্টিয়ায় চিরকুট লিখে প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা/এনজিও ঋণ ও প্রবাসজীবনের চাপের নীরব ট্র্যাজেডি সংবাদ বিশ্লেষণ/১১ জেলায় বিজিবির সঙ্গে আনসার বাহিনী দিয়ে সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা বলয়, বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব পোড়াদহ জংশন থেকে অপহৃত ৩ শিশু ঢাকায় উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২ এবারও আদালত গ্রহণ করলো না ইউনূস-নূরজাহানসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা অধ্যাপক আবুল বারকাতের শর্ত সাপেক্ষ জামিন বাজারের আগুন, মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস/ সরকার কি পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারছে? তিন বগি লাইনচ্যুত, খুলনার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগ বন্ধ রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড

পদ্মা ব্যারাজ/বাংলাদেশের পানি-রাজনীতির নতুন অধ্যায়

ড. আমানুর আমানের কলাম/
বাংলাদেশ ব-দ্বীপে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই নদী শুধু ভূগোল নয়, অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও সভ্যতারও কেন্দ্রবিন্দু। অথচ সেই নদীনির্ভর দেশটিই গত পাঁচ দশক ধরে এক ভয়াবহ জলসংকটের নীরব মূল্য দিচ্ছে। এর মূল কারন হলো এই নদীগুলোর নাব্যতা নিয়ন্ত্রিত ; এবং যা বাংলাদেশের হাতে নেই। নদীগুলোর অববাহিকায় উজান থেকে দুটি বৃহৎ রাষ্ট্র এই পানি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। দেশ দুটি হলো ভারত ও চীন। দেশ দুটির অব্যাহ পানি রাজনীতির যুপকাষ্ঠে বলি হয়ে আসছে এই ছোট ছাইদ্বীপটি।
১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো ধীরে ধীরে প্রাণ হারাতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদে এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার উপর। যেখানে বসবাস প্রায় দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ।
এসব এলাকায় প্রবাহিত গড়াই, মধুমতি, হিসনা, মাথাভাঙ্গা, বড়াল কিংবা ইছামতির মতো মিঠাপানির নদীগুলো শুকিয়ে গেছে ; বেড়েছে লবণাক্ততা, কমেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যও পড়ে অস্তিত্ব সংকটে।নদীগুলোর পানির উৎস পদ্মা নদী; যে নদীটি গঙ্গার অববাহিকা। গঙ্গার পানি নিয়ন্ত্রিত হয় ঐ দুটি দেশের মাধ্যমে। পদ্মার পানির মূল নিয়ন্ত্রক ভারত। ভারতের করা ফারাক্কা বাঁধ এই নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। কিন্তু বাংলাদেশের হাতে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, যদিও পদ্মার একটি বৃহৎ অংশ বাংলাদেশে।
এই বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিছক একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পানি-নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে পুনর্জাগরণের এক কৌশলগত উদ্যোগ।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের মাধ্যমে অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রকল্প মূলত ফারাক্কার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার একটি বাস্তবভিত্তিক উত্তর। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে গঙ্গার পানিবণ্টনে ন্যায্য হিস্যার দাবি জানিয়ে এলেও বাস্তবে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের ঘাটতি থেকেই গেছে। ফলে নদী পুনরুদ্ধার ও পানি সংরক্ষণের জন্য নিজস্ব অবকাঠামো তৈরি ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প ছিল না।
পদ্মা ব্যারাজ সেই প্রয়োজন থেকেই এসেছে। রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মিতব্য ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে। পরে সেই পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন শাখা নদীতে সরবরাহ করা হবে। এর ফলে মৃতপ্রায় নদীগুলোতে আবারও প্রবাহ ফিরবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌচলাচল ও পরিবেশে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে এই প্রকল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি, সুপেয় পানি ও বনসম্পদ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সুন্দরবনের কেওড়াসহ বিভিন্ন উদ্ভিদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়লে শুধু কৃষিই নয়, পুরো উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র নতুন প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
তবে পদ্মা ব্যারাজের গুরুত্ব শুধু পরিবেশে সীমাবদ্ধ নয়। এটি অর্থনীতির জন্যও একটি সম্ভাবনাময় প্রকল্প। প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্প থেকে বছরে আনুমানিক ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা এটিকে বহুমুখী প্রকল্পে পরিণত করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নদী ব্যবস্থাকে ‘সিস্টেম’ হিসেবে বিবেচনা করা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন নদী ব্যবস্থাপনায় খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি নদী ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।
তবে এত বড় প্রকল্পের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি বদলে গেলে উজানে ভাঙন এবং ভাটিতে পলি জমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, নদীর হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল পরিবর্তন মোকাবিলা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকানো হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রায়ই সময় ও ব্যয় বাড়ার অভিযোগ ওঠে। পদ্মা ব্যারাজের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি এবং দক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই প্রকল্পকে শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতীক বানালে চলবে না। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পানি-কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ আগামী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হবে পানি। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ তাই কেবল একটি বাঁধ নয়; এটি বাংলাদেশের নদী পুনরুদ্ধার, পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক টেকসইতার লড়াইয়ের নতুন প্রতীক। সফল বাস্তবায়ন হলে এটি হতে পারে ফারাক্কার দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম বড় পদক্ষেপ।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস/

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net