May 5, 2026, 12:11 pm

ড. আমানুর আমানের কলাম/
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিধস পরাজয় এবং ভারতীয় জনতা পার্টি-এর গগনবিদারী উত্থান বিশ্লেষণ করতে গেলে ইতিহাস, ভৌগলিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। এই পরিবর্তনকে কোনো একক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না; বরং বলতে হবে এটি একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ার ফল। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই উত্থানকে এমন এক রূপান্তর হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে বিকল্প নেতৃত্বের প্রতি জনমানসে আগ্রহ ক্রমে বেড়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ-এর রাজনীতি দীর্ঘ সময় ধরে আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চার জন্য স্বতন্ত্র পরিচিতি বহন করে এসেছে। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে কংগ্রেসের প্রভাব থাকলেও, ষাট ও সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক বিক্ষোভ এবং বামপন্থী মতাদর্শের ক্রমবর্ধমান সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপথকে আমূল বদলে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী)-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে টানা প্রায় সাড়ে তিন দশক রাজ্য শাসন করে, যা ভারতীয় গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
এই দীর্ঘ শাসনামলে ভূমি সংস্কার, বিশেষ করে ‘অপারেশন বর্গা’, গ্রামীণ কৃষকসমাজকে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন দেয়। একই সঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনে অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। বামফ্রন্টের সাংগঠনিক দৃঢ়তা, ক্যাডারভিত্তিক কাঠামো এবং আদর্শিক শৃঙ্খলা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ফলে রাজনীতি শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
তবে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে একসময় এই শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যেই স্থবিরতা, প্রশাসনিক জড়তা এবং আত্মতুষ্টির প্রবণতা তৈরি হয়। শিল্পায়নে পিছিয়ে পড়া, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দলীয় নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। বিশেষ করে সিঙ্গুর আন্দোলন ও নন্দীগ্রাম আন্দোলন বামফ্রন্ট সরকারের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয় এবং জনমনে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই রাজনৈতিক আবহেই তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সালে “পরিবর্তন”-এর স্লোগানকে সামনে রেখে ক্ষমতায় আসে। প্রথমদিকে দলটি দীর্ঘদিনের শাসন-অবসানের প্রতীক হিসেবে বিপুল জনসমর্থন পায় এবং প্রশাসনিক গতি, জনমুখী কর্মসূচি ও নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য দিয়ে আশার সঞ্চার করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় আধিপত্যের সমালোচনা বাড়তে থাকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস আবারও এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পরিবর্তনের প্রশ্ন নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভৌগলিক দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ একটি সীমান্তবর্তী রাজ্য, যার সীমানা বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যুক্ত। এই অবস্থান অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে। উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং দক্ষিণবঙ্গ—এই তিনটি অঞ্চলের ভৌগলিক বৈচিত্র্য রাজনৈতিক আচরণেও পার্থক্য তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরবঙ্গে জাতিগত ও আঞ্চলিক পরিচয়ের প্রশ্ন, জঙ্গলমহলে আদিবাসী ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত অসন্তোষ, আর দক্ষিণবঙ্গে নগর-গ্রামীণ বিভাজন—সব মিলিয়ে ভোটের প্যাটার্নকে জটিল করে তোলে। এই ভৌগলিক বৈচিত্র্যের মধ্যেই বিজেপি সংগঠন বিস্তার করে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে।
সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ-এর রাজনীতি বাঙালি ভাষা, সাহিত্যচর্চা, লোকঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী ধারার সঙ্গে গভীরভাবে নিবিড়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লালন শাহ এবং কাজী নজরুল ইসলাম-এর দর্শন—যেখানে মানবিকতা, সাম্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা উচ্চারিত—এই অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করেছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে এক ধরনের উদার, বৌদ্ধিক ও বিতর্কনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে পরিচয়ের প্রশ্নটি কেবল ধর্মে সীমাবদ্ধ না থেকে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সাংস্কৃতিক পরিসরে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থান, বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ, রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিচয় রাজনীতির প্রসার এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জনতা পার্টি একটি সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী বয়ান সামনে এনে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের ধারণা তুলে ধরছে, যেখানে ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয় এক ধরনের সমন্বিত কাঠামোয় উপস্থাপিত হয়।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস আঞ্চলিক বাঙালি পরিচয়, ভাষাভিত্তিক ঐক্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সহাবস্থানের ওপর জোর দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে চায়। তারা স্থানীয় সংস্কৃতি, উৎসব ও ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে একধরনের আঞ্চলিক সংহতির ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
এই দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা কেবল মতাদর্শগত নয়; বরং এটি ভোটারদের পরিচয়বোধ, নিরাপত্তা-অনুভূতি এবং উন্নয়ন প্রত্যাশার সঙ্গেও জড়িত। ফলে একাংশের কাছে জাতীয়তাবাদী বক্তব্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠলেও, অন্য অংশ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও সহাবস্থানের রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই দ্বৈত প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন এক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে সাংস্কৃতিক পরিচয়ই অনেক ক্ষেত্রে ভোটের আচরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠছে। একই প্রেক্ষাপট যদি অন্যভাবে বলি সেটা দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যগত ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবতাবাদী চেতনার পাশাপাশি এখন একটি অংশ বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করে দেখতে আগ্রহী হচ্ছে। বিজেপি এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে “জাতীয় মূলধারার সঙ্গে সংযুক্তি” ধারণাটিকে সামনে এনেছে, যা কিছু ভোটারের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তবে একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাঙালি পরিচয়ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে—এখানেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন এবং স্থানীয় স্তরে দলীয় আধিপত্যের সমালোচনা রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। একই সঙ্গে কল্যাণমূলক প্রকল্প, যেমন—সামাজিক নিরাপত্তা, নারীকল্যাণ ও গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি—তৃণমূলের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ফলে একদিকে অসন্তোষ, অন্যদিকে নির্ভরতা—এই দ্বৈত বাস্তবতা ভোট আচরণকে জটিল করে তোলে।
অন্যদিকে বিজেপি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সুবিধা, সংগঠনিক শক্তি এবং জাতীয় রাজনীতির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেছে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, বিশেষ করে আর্থিক বরাদ্দ, প্রশাসনিক সংঘাত এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব বিষয়ও ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলে। বিজেপির পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিরোধী ভোটের সংহতি; বাম ও কংগ্রেসের দুর্বলতা অনেক ক্ষেত্রে বিজেপিকে প্রধান বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে তৃণমূল কংগ্রেস-এর সম্পূর্ণ পতন বা ভারতীয় জনতা পার্টি-এর নিশ্চিত জয়—এমন সরলীকৃত বিশ্লেষণ বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পশ্চিমবঙ্গ-এর রাজনীতি স্বভাবতই বহুমাত্রিক ও গতিশীল, যেখানে একক কোনো প্রবণতা স্থায়ীভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এখানে স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, প্রার্থী নির্বাচনের কৌশল, নির্বাচনী জোটের রসায়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সমর্থন—সব মিলিয়ে ফল নির্ধারণে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়।
বিশেষ করে নারী ভোটারদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অবস্থান এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা নির্বাচনী আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কল্যাণমূলক কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সেবার প্রাপ্যতা—এসব বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে সরাসরি ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষা, সংগঠনের শক্তি এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিকে কোনো সরল দ্বিমুখী লড়াই হিসেবে দেখা যথাযথ নয়; বরং এটি এক চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি নির্বাচন নতুন বাস্তবতা ও নতুন ভারসাম্য তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে যেকোনো দলের সাফল্য নির্ভর করে তাদের কতটা কার্যকরভাবে এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে বুঝে কৌশল নির্ধারণ করতে পারে তার ওপর।
সব মিলিয়ে, বিজেপির উত্থান একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া—যেখানে ইতিহাসের উত্তরাধিকার, ভৌগলিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক রূপান্তর এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক কৌশল একে অপরের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত। এই পরিবর্তনকে বুঝতে হলে একক কোনো কারণ নয়, বরং এই সবগুলো উপাদানের সমন্বিত প্রভাবকে বিবেচনায় নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।