May 1, 2026, 9:22 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশ গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে আবারও পিছিয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম হয়েছে। এ খবরটি কেবল একটি আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের তথ্য নয়; বরং এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় সহনশীলতা, আইন কাঠামো এবং সংবাদমাধ্যমের বাস্তব পরিবেশ সম্পর্কে একটি বড় সতর্ক সংকেত। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সংকটেরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সংকট এখন আর শুধু সাংবাদিক নির্যাতন বা কোনো একটি আইনকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে আরএসএফ যে “রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট” স্কোরের বড় পতনের কথা বলেছে, সেটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল আইন দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং রাষ্ট্র কতটা সমালোচনা সহ্য করতে পারে, বিরোধী মতকে কতটা জায়গা দেয়, এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা জবাবদিহিমূলক—এসবের ওপরই মূলত নির্ভর করে।
বাংলাদেশে গত এক দশকে গণমাধ্যমের চরিত্রে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। একসময় সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে ক্ষমতার সমালোচনা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেলেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই আত্মনিয়ন্ত্রণ বা “সেলফ সেন্সরশিপ” স্পষ্ট। সাংবাদিকরা প্রায়ই এমন বিষয় এড়িয়ে চলেন, যা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। কারণ, মামলা, হয়রানি, চাকরি হারানোর ভয় কিংবা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো আইনি ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করেছে। যদিও সরকার বারবার দাবি করেছে যে এসব আইন অপব্যবহারের জন্য নয়, বাস্তবে বহু সাংবাদিক ও নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো—বাংলাদেশে গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম এখন রাজনৈতিক বা করপোরেট স্বার্থের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে “স্বাধীন সম্পাদকীয় অবস্থান” ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সংবাদমাধ্যম টিকে থাকার জন্য বিজ্ঞাপননির্ভর হয়ে পড়েছে, আর সরকারি বিজ্ঞাপন বা বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব অনেক সময় সম্পাদকীয় নীতিকে প্রভাবিত করে। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখনও সরকারীভাবে প্রকাশিত অনেক ক্রোড়পত্র রাজনিতক বিবেচনায় প্রদান করা হচ্ছে। ফলে অনেক ভালো মানের স্বাধীন পত্রিকা এ বিজ্ঞাপন পাচ্ছে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও আছে। বাংলাদেশে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে মিডিয়ার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু স্বাধীনতার মান একই অনুপাতে বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে “বহুমাত্রিক মিডিয়া” থাকলেও “বহুমতের নিরাপদ প্রকাশ” সংকুচিত হয়েছে।
তবে এই পরিস্থিতিকে শুধু বাংলাদেশের একক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আরএসএফের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বজুড়েই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবনতি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশও পিছিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থাও উদ্বেগজনক। অর্থাৎ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল নজরদারি এবং ভুয়া তথ্যের বিস্তার এখন বৈশ্বিক সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদ্বেগ বেশি, কারণ এখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার আরেকটি বড় সংকট হলো—সংবাদমাধ্যমকে প্রায়ই “রাষ্ট্রের অংশ” হিসেবে দেখতে চাওয়া হয়, “রাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক” হিসেবে নয়। অথচ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমের কাজ সরকারের প্রশংসা করা নয়; বরং জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা। দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নির্বাচন, বিচারবহির্ভূত ঘটনা বা মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করাই সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু যখন সমালোচনাকে “রাষ্ট্রবিরোধিতা” হিসেবে দেখা হয়, তখন স্বাধীন সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এখানে আরেকটি সামাজিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সমাজ ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়েছে। ফলে সাংবাদিকদেরও প্রায়ই “পক্ষ” বেছে নিতে চাপের মুখে পড়তে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, হুমকি বা সংগঠিত আক্রমণ এখন সাংবাদিকদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই আক্রমণ আরও বেশি ব্যক্তিগত ও সহিংস রূপ নেয়।
তবে পুরো চিত্রটি একেবারে অন্ধকারও নয়। বাংলাদেশে এখনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হচ্ছে, স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, পরিবেশ, দুর্নীতি, শ্রম অধিকার ও মানবিক সংকট নিয়ে কাজ করছেন অনেক সাংবাদিক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নতুন প্রজন্মের কিছু স্বাধীন কণ্ঠও তৈরি করেছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ টেকসই করতে হলে রাষ্ট্রীয় সহনশীলতা, আইনি সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা—এই তিনটির সমন্বয় প্রয়োজন।
গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবনতি আসলে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রশ্নও। কারণ বিদেশি বিনিয়োগ, মানবাধিকার পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছুর সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি রাষ্ট্র যত বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়, সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকেও তত বেশি জায়গা দেয়। আর যে রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পায়, সেখানে গণমাধ্যম ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকভাবে থাকলেও কার্যকরভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
সবশেষে বলা যায়, গণমাধ্যম স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের ইস্যু নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা এবং গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ধারণের অন্যতম মানদণ্ড। বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তাহলে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের নয়—আস্থার জায়গা হিসেবে দেখতে হবে।